এস আই খান:
গত ২০২৪ সালের জুলাই এবং আগস্ট মাসে বাংলাদেশে যে নজিরবিহীন গণ-অভ্যুত্থান ঘটেছিল, তার সমান্তরালে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর দিয়ে এক প্রলয়ংকরী ঝড় বয়ে গেছে। গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক গভর্নেন্স বা জিসিডিজি কর্তৃক প্রকাশিত ১৬১ পৃষ্ঠার দীর্ঘ শ্বেতপত্রটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একটি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রধান স্তম্ভগুলো অর্থাৎ পুলিশ বাহিনী, কারাগার এবং অস্ত্রাগার কীভাবে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিল।
এই বিশাল দলিলে উঠে আসা তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে, এটি কেবল একটি বিশৃঙ্খলা ছিল না বরং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার এক আমূল বিপর্যয় ছিল।
প্রতিবেদনের প্রাথমিক অংশে বাংলাদেশের কারাগারগুলোর ওপর হওয়া নজিরবিহীন হামলার চিত্র ফুটে উঠেছে। ইতিহাসের কোনো এক সন্ধিক্ষণে দেশের ১৭টি কারাগারে একযোগে হামলা হওয়া এবং ৫টি কারাগার থেকে ২,২৪৭ জন বন্দীর পলায়ন রাষ্ট্রের বিচারিক কাঠামোর ভিত্তি নাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে নরসিংদী জেলা কারাগারের ঘটনাটি ছিল অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
সেখানে শত শত কারারক্ষীকে জিম্মি করে ৮২৬ জন বন্দীকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এই পলাতক বন্দীদের মধ্যে ৯ জন ছিল দুর্ধর্ষ জঙ্গি সদস্য, যারা আনসারুল্লাহ বাংলা টিম এবং জেএমবির মতো নিষিদ্ধ সংগঠনের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে কাজ করত। এই জঙ্গিদের বর্তমানে কোনো হদিস না থাকা জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।
কারাগারের বাইরে পুলিশ বাহিনীর ওপর যে পরিমাণ সহিংসতা হয়েছে, তার বিবরণ প্রতিবেদনের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে। সারা দেশে মোট ৪৬০টি পুলিশ স্থাপনা বা থানায় হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৫৪টি থানা এবং ১০৬টি পুলিশ বক্স আগুনে পুড়িয়ে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। রাজধানী ঢাকার বাড্ডা, ভাটারা এবং উত্তরা পূর্ব থানার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোর অবকাঠামো বর্তমানে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
জিসিডিজি-র পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই ধ্বংসযজ্ঞের ফলে পুলিশের ৩০০টি গাড়ি ভস্মীভূত হয়েছে এবং ৫৪৮টি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। সব মিলিয়ে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬০৭ কোটি টাকা, যা একটি উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতির জন্য এক বিশাল বোঝা।
প্রতিবেদনের সবচেয়ে স্পর্শকাতর এবং ভয়ংকর অংশটি হলো বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ লুটপাট।
থানা এবং কারাগারগুলো থেকে মোট ৫,৭৫৬টি বিভিন্ন ধরনের অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র লুট হয়েছে। এর সাথে সাড়ে ছয় লাখের বেশি গোলাবারুদ এখন সাধারণ মানুষের হাতে চলে গেছে। যদিও পরবর্তী সময়ে বিশেষ অভিযানে অনেক অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে, তবুও ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত ১,৩৪৩টি অস্ত্র এবং প্রায় আড়াই লাখ রাউন্ড গোলাবারুদ এখনো নিখোঁজ রয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ মারণাস্ত্র অপরাধী বা উগ্রবাদী গোষ্ঠীর হাতে থাকা মানে হলো দেশের প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় এক অদৃশ্য টাইমবোমা মজুত থাকা।
হামলার শিকার পুলিশ সদস্যদের মানবিক বিপর্যয়ের চিত্রটিও এই ১৬১ পৃষ্ঠার নথিতে অত্যন্ত বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে। বিশেষ করে যাত্রাবাড়ী থানায় ৮ জন পুলিশ সদস্যকে যেভাবে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা কোনো সভ্য সমাজের জন্য কাম্য হতে পারে না। এই ধরনের গণপিটুনি এবং সহিংসতার ফলে পুরো পুলিশ বাহিনীর মধ্যে এক ধরনের চরম মনস্তাত্ত্বিক ভীতি ও আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। এর পাশাপাশি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে পুলিশ প্রশাসনে যে ব্যাপক রদবদল, বাধ্যতামূলক অবসর এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ৩২১ জন সাব-ইন্সপেক্টরকে অব্যাহতি দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে, তা মাঠ পর্যায়ে জনবল সংকটকে আরও প্রকট করে তুলেছে।
প্রতিবেদনের শেষভাগে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে যে, কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া জঙ্গিদের অবিলম্বে গ্রেফতার এবং সাধারণ মানুষের হাতে থাকা ১,৩৪৩টি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা না গেলে আগামী দিনের রাজনৈতিক বা সামাজিক যেকোনো অস্থিরতায় ভয়াবহ প্রাণহানি ঘটতে পারে। পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। জিসিডিজি-র এই ১৬১ পৃষ্ঠার শ্বেতপত্রটি মূলত আমাদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার একটি ক্ষতবিক্ষত দর্পণ হিসেবে কাজ করছে, যা থেকে শিক্ষা নিয়ে দ্রুত সংস্কার কার্যক্রম শুরু করা জরুরি।
সবশেষে বলা যায়, ২০২৪ সালের সেই উত্তাল সময়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে ঐতিহাসিক ধস নেমেছিল, তা কাটিয়ে উঠতে কেবল সময়ের প্রয়োজন নয় বরং প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী এবং নিরপেক্ষ পরিকল্পনা। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা যদি ভেঙে পড়ে তবে সাধারণ নাগরিকের জানমালের কোনো নিশ্চয়তা থাকে না। তাই এই প্রতিবেদনের প্রতিটি তথ্যকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়ে নিখোঁজ অস্ত্র এবং আসামিদের খুঁজে বের করাই হওয়া উচিত বর্তমান প্রশাসনের প্রথম ও প্রধান অগ্রাধিকার।