কেরানীগঞ্জে অবৈধ গ্যাস সংযোগে কোটি কোটি টাকা লুট

Date: 2026-01-03
news-banner

স্টাফ রিপোর্টার 

ঢাকার কেরানীগঞ্জ উপজেলায় তিতাস গ্যাসের কিছু অসাধু ঠিকাদার, কর্মকর্তা ও দালালচক্রের যোগসাজশে অবৈধ গ্যাস সংযোগ দিয়ে সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হাতিয়ে নেওয়ার ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে। এই চক্রের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন কুখ্যাত ঠিকাদার রফিক যার নেতৃত্বে দীর্ঘদিন ধরে চলছে একটি শক্তিশালী গ্যাস-সিন্ডিকেট।

স্থানীয় সূত্র ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, দিনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ অভিযান চালিয়ে অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলেও রাত নামলেই ঠিকাদার রফিকের নির্দেশে তার পালিত দালালরা পুনরায় গোপনে সংযোগ দিয়ে দিচ্ছে। ফলে কলকারখানা ও আবাসিক ভবনগুলো নির্বিঘ্নে আবারও অবৈধভাবে গ্যাস ব্যবহার শুরু করে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কেরানীগঞ্জ তিতাস অফিসের পেছনে অবস্থিত মডেল টাউন হাউজিং এলাকাতেই রয়েছে এক হাজারের বেশি অবৈধ গ্যাস সংযোগ। অভিযোগ রয়েছে, সোর্স গনি ও তার সহযোগীদের মাধ্যমে এই চক্র প্রতি মাসে কোটি টাকা উত্তোলন করছে। এর ফলে তিতাস গ্যাস প্রতিবছর প্রায় শত কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতির মুখে পড়ছে।

আরও অভিযোগ উঠেছে, ঠিকাদার রফিক নিজেকে প্রভাবশালী ব্যক্তির আত্মীয় পরিচয় দিয়ে কেরানীগঞ্জে কর্মরত সাংবাদিকদের সংবাদ প্রকাশ না করতে ভয়ভীতি ও চাপ প্রয়োগ করেন।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, কেরানীগঞ্জ তিতাস অফিসের কিছু অসাধু কর্মচারী ও ঠিকাদার বাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ দিয়ে নিয়মিত মাসোয়ারা আদায় করা হচ্ছে। কুন্ডা ইউনিয়ন থেকে হাজরতপুর পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় রফিকের নেতৃত্বে একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। এসব এলাকায় কলকারখানা, ওয়াশ প্লান্ট ও আবাসিক ভবনে অতিরিক্ত চুলায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ দিয়ে মাসিক অর্থ আদায় করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক পুলিশ কর্মকর্তার সন্তান জুলাই যোদ্ধা মো. সুমন বলেন,
“কেরানীগঞ্জে শত শত অবৈধ ওয়াশ কারখানা ও টেম্পারিং ভাট্টি রয়েছে। একটি কারখানায় যে পরিমাণ গ্যাস ব্যবহার হয়, তা দিয়ে প্রায় তিন হাজার আবাসিক বাড়ির চুলা জ্বালানো সম্ভব। এসব অবৈধ সংযোগ বন্ধ না করলে অচিরেই কেরানীগঞ্জে ভয়াবহ গ্যাস সংকট দেখা দেবে।”
সরেজমিনে সাংবাদিকদের একটি টিম হাজরতপুর, কলাতিয়া, তারানগর, শাক্তা, রুহিতপুর, বাস্তা, কালিন্দী, জিনজিরা, আগানগর, তেঘরিয়া, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ ও কন্ডা এলাকায় ব্যাপক অবৈধ গ্যাস সংযোগের তথ্য পেয়েছে। পাশাপাশি ভাওয়াল, নেক রোজবাগ, বরিশুর আটি বাজার থেকে খোলামুড়া ও বাহেরচর এলাকাতেও একাধিক ভাট্টি ও ওয়াশ কারখানায় অবৈধ সংযোগের অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, শুধু ভবন ও অতিরিক্ত চুলা ব্যবহারকারীদের কাছ থেকেই প্রতি মাসে প্রায় দেড় কোটি টাকা আদায় করা হচ্ছে, যা তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে তোলা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক গ্রাহক জানান, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তাদের বাসাবাড়িতে অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়েছে এবং তারা প্রতি মাসে নির্ধারিত টাকা দালালদের মাধ্যমে ঠিকাদারের লোকদের হাতে তুলে দেন। অভিযানের পর সাময়িকভাবে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও পুনরায় অর্থের বিনিময়ে গোপনে সংযোগ দেওয়া হয়।
একজন দালালচক্রের সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“আমরা ঠিকাদারকে টাকা দিয়েই বাসাবাড়ি ও কারখানায় গ্যাস সংযোগ দিয়ে থাকি। গ্রাহকদের কাছ থেকে বিল তুলে ঠিকাদারের কাছে জমা দিই।”

এ বিষয়ে ঠিকাদার রফিকের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কেরানীগঞ্জ তিতাস গ্যাস অফিসের ডিজিএম মো. জিয়া বলেন, “আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে। যেসব এলাকায় বেশি পরিমাণে অবৈধ গ্যাস সংযোগ রয়েছে, সেখানে দ্রুত অভিযান চালানো হবে। অবৈধ সংযোগকারীদের বিরুদ্ধে মামলা এবং জড়িত ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তিতাস গ্যাসের মেট্রো ঢাকা বিপণন বিভাগ-২ এর উপ-মহাব্যবস্থাপক জানান, “কেরানীগঞ্জে অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার অভিযান অব্যাহত থাকলেও দালালচক্রের প্রলোভনে অনেক গ্রাহক এখনও অবৈধ সংযোগ নিচ্ছেন। এতে দেশের মূল্যবান খনিজ সম্পদের অপচয় হচ্ছে এবং সরকার প্রতি মাসে বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে।”

Leave Your Comments