৩ কোটির সেতুতে এখন ‘মরণফাঁদ’! ​দুই শিশুর প্রাণ গেলেও টনক নড়েনি কর্তৃপক্ষের, ভোগান্তিতে হাজারো মানুষ

Date: 2026-05-12
news-banner

​আব্দুল কাইয়ুম আরজু, পটুয়াখালী প্রতিনিধি:

পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সংলগ্ন লতাচাপলী ইউনিয়নে খালের ওপর সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে একটি কংক্রিটের সেতু। প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই সেতুর মূল কাঠামো গত চার বছর ধরে দৃশ্যমান থাকলেও দুই পাশে কোনো সংযোগ সড়ক (অ্যাপ্রোচ রোড) নেই। ফলে বিশাল বাজেটের এই প্রকল্পটি এলাকাবাসীর কোনো কাজে তো আসছেই না, উল্টো দুর্ভোগের এক বড় প্রতীকে পরিণত হয়েছে। সংযোগ সড়কের অভাবে কয়েক হাজার মানুষ এখনো জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাঁশের সাঁকো দিয়েই পারাপার হচ্ছেন।

​স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, ‘দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় মহিপুর থানাধীন লতাচাপলী ইউনিয়নের ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সীমান্তবর্তী খালের ওপর ৩৫ মিটার দীর্ঘ ও ৭ দশমিক ৩২ মিটার প্রস্থের এই আরসিসি স্লাব সেতুটি নির্মাণ করা হয়। প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ কোটি ৯২ লাখ ২২ হাজার টাকা।

​সরেজমিনে দেখা গেছে, সেতুর মূল ঢালাই কাজ কয়েক বছর আগে শেষ হলেও পূর্ব পাশে প্রায় ২০০ মিটার এবং পশ্চিম পাশে ৫০ মিটার সংযোগ সড়কের কাজ মাটি কাটা পর্যায়েই থমকে আছে। সেতুর দুই পাশেই এখন বিশাল গর্ত আর খানাখন্দ। ফলে সেতুটি অনেকটা খালের মাঝখানে ‘বিচ্ছিন্ন দ্বীপের’ মতো দাঁড়িয়ে আছে। স্থানীয়রা বাধ্য হয়ে সেতুর পাশেই একটি নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো তৈরি করেছেন।

​সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে খাজুরা আশ্রয়ন কেন্দ্রের ৬০টি পরিবার ও আশপাশের ৫-৬টি গ্রামের মানুষ। বিশেষ করে খাজুরা আশ্রয়ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও আলহাজ্ব আবু হানিফ খান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন এই মরণফাঁদ পার হয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হয়। বর্ষা মৌসুমে দুই পাশ পানিতে ডুবে গেলে যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

​ফাঁসিপাড়া গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা আয়েশা বেগম জানান, বর্ষায় নাতনিদের স্কুলে পাঠাতে পারেন না। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সেতু আছে কিন্তু ওঠার রাস্তা নাই। আমাদের কপালে এইডা কী উন্নয়ন? তিন বছর আগে এইহানে দুইডা শিশু পানিতে ডুইব্যা মরছে, তাও সরকারের হুঁশ হয় নাই।”

​এলজিইডি কলাপাড়া উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি পটুয়াখালী চেম্বার্স অব কমার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি গিয়াস উদ্দিন কাজটির কার্যাদেশ পান। অভিযোগ রয়েছে, তিনি কাজটি পেয়ে অন্য একজনকে হস্তান্তর করেন, যার ফলে কাজে চরম অবহেলা ও দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেয়। ২০২৩ সালের মে মাসে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কয়েক দফা সময় বাড়িয়ে চলতি বছরের ৩১ মে পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।

​এ বিষয়ে জানতে চাইলে কলাপাড়া উপজেলা প্রকৌশলী মো. মনির হোসেন বলেন, “ঠিকাদার নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না করায় এলাকাবাসী ভোগান্তিতে পড়েছেন। তবে বর্তমানে সংযোগ সড়কের কাজ শুরু হয়েছে। আশা করছি চলতি মাসের (মে) মধ্যেই পুরো কাজ শেষ করে সেতুটি চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা সম্ভব হবে।”

​তবে স্থানীয়দের শঙ্কা, বর্ষা শুরু হওয়ার আগে কাজ শেষ না হলে এবারের বর্ষাতেও শিশুদের জীবন ঝুঁকি আর ‘অভিশপ্ত’ ভোগান্তি পোহাতে হবে তাদের।

Leave Your Comments