বাঘায় জীবনের ঝুঁকিতে ৫ হাজার মানুষ, হাতুড়ে ডাক্তারই ভরসা

Date: 2026-05-30
news-banner

নিজস্ব প্রতিনিধি :


রাজশাহীর বাঘা উপজেলার বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল চকরাজাপুর ইউনিয়নের তিনটি ওয়ার্ডে বসবাসকারী প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ আজও মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত।  পদ্মা নদীর বুকজুড়ে বিস্তৃত আতারপাড়া (১ নম্বর ওয়ার্ড), চৌমাদিয়া (২ নম্বর ওয়ার্ড) ও দিয়ারকাদিরপুর (৩ নম্বর ওয়ার্ড) এলাকায় নেই কোনো সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র কিংবা জরুরি চিকিৎসাসেবা। ফলে অসুস্থ হলে গ্রাম্য চিকিৎসকরাই হয়ে ওঠেন চরবাসীর একমাত্র ভরসা।


‎স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জটিল রোগী, স্ট্রোক আক্রান্ত ব্যক্তি কিংবা গর্ভবতী নারীকে চিকিৎসার জন্য নিতে হয় প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরের বাঘা উপজেলা সদর অথবা ৮০ কিলোমিটার দূরের রাজশাহী শহরে। এই দীর্ঘ যাত্রাপথে পাড়ি দিতে হয় পদ্মা নদী ও দুর্গম চরাঞ্চল। বর্ষা মৌসুমে নৌকায় চলাচল কিছুটা সহজ হলেও শুষ্ক মৌসুমে বিশাল চর হেঁটে অতিক্রম করে আবার নৌকায় নদী পার হতে হয়। পাশাপাশি যাতায়াতের পথে একাধিক স্থানে টোলও দিতে হয়।


‎স্থানীয়দের অভিযোগ, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও এ অঞ্চলে কোনো কমিউনিটি ক্লিনিক বা স্বাস্থ্য উপকেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। ফলে প্রসূতি মা, শিশু ও বয়স্ক রোগীদের সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয়। মাঝরাতে কেউ অসুস্থ হলে চিকিৎসা পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। বর্ষাকালে নদীতে স্রোত বেড়ে গেলে রোগী নিয়ে পারাপার করা হয়ে ওঠে জীবন-মৃত্যুর লড়াই।


‎আতারপাড়া চরের বাসিন্দা ছলেমান আলী বলেন, বাড়িতে অসুস্থ মা রয়েছে।  রাতে অসুস্থ হলে আতঙ্কে থাকতে হয়। কখন নৌকা পাব, কীভাবে চর পার হব, কখন হাসপাতালে পৌঁছাব—এসব চিন্তা মাথায় ঘোরে। 


‎দিয়ারকাদিরপুর চরের বেল্লাল হোসেন জানান, একদিন রাতে মালেক আলী ব্যাপারীর মেয়ের প্রসববেদনা ওঠে। মাঝরাতে দুই-তিনজন মিলে তাকে কোলে করে নৌকা পর্যন্ত নিয়ে যাই। এর মধ্যেই নৌকায় তার সন্তান জন্ম নেয়। কিন্তু প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। এরপর পদ্মা নদী পার হয়ে তাকে ঘাটে নামানো হয়। সেখান থেকে কাঁধে বহন করে অটোরিকশাযোগে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়।


‎চৌমাদিয়া চরের গ্রাম্য চিকিৎসক মাসুম মোল্লা বলেন, সাধারণ চিকিৎসা দেওয়া গেলেও হৃদরোগ, স্ট্রোক বা প্রসূতি জটিলতার ক্ষেত্রে আমাদের কিছুই করার থাকে না।  সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব না হওয়ায় অনেক রোগী পথেই মারা যান।


‎চকরাজাপুর ইউনিয়নের আতারপাড়া ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য আবদুর রহমান দর্জি বলেন, আমরা অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু এখনো একটি কমিউনিটি ক্লিনিক পাইনি।  এখানকার পাঁচ হাজার মানুষ কোনো স্বাস্থ্যসেবা পায় না।  তাদের একমাত্র ভরসা গ্রামের হাতুড়ে ডাক্তার, যারা আবার পশুর চিকিৎসাও করেন। 


‎তিনি আরও বলেন, তিনটি চরের মানুষের জন্য রয়েছে মাত্র একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। নেই কোনো মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্র।


‎উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আসাদুজ্জামান আসাদ জানান, চকরাজাপুর ইউনিয়নে দুটি কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে একটি পদ্মা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে এবং অন্যটির কাজ চলমান রয়েছে। তবে আতারপাড়া, চৌমাদিয়া ও দিয়ারকাদিরপুর এলাকায় এখনো কোনো কমিউনিটি ক্লিনিক নেই।


‎তিনি বলেন, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং নতুন করে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।


Leave Your Comments