সাইফুল ইসলাম মানিক , নীলফামারী:
নীলফামারীর ডোমারে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) পরিচালিত ভিত্তি বীজ আলু উৎপাদন খামারে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি, রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমানো এবং ফসলের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে ব্যাপক পরিসরে ধইঞ্চা চাষ করা হয়েছে। চলতি মৌসুমে খামারটির ২০০ একর জমিতে ধইঞ্চা আবাদ করা হয়েছে, যা সবুজ সার হিসেবে ব্যবহারের মাধ্যমে মাটির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
খামার কর্তৃপক্ষ জানায়, ধইঞ্চা গাছ ৪ থেকে ৫ ফুট উচ্চতায় পৌঁছালে ট্রাক্টরের মাধ্যমে হালচাষ করে তা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এসব গাছ পচে জৈব পদার্থে পরিণত হয় এবং মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে। কৃষিবিজ্ঞানীদের মতে, ধইঞ্চা একটি উৎকৃষ্ট সবুজ সার, যা মাটির জৈব উপাদান বৃদ্ধি, পানিধারণ ক্ষমতা উন্নয়ন এবং মাটির গঠন ও বুনট উন্নত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
খামার সূত্রে জানা গেছে, ৬০১ একরের এই খামারটিতে দীর্ঘদিন ধরে ভিত্তি বীজ আলু উৎপাদন করা হলেও আলু উত্তোলনের পর বিপুল পরিমাণ জমি কয়েক মাস পতিত অবস্থায় পড়ে থাকত। এতে জমির উৎপাদনক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি মাটির পুষ্টিগুণও কমে যেত। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে কয়েক বছর আগে পতিত জমিতে ধৈঞ্চা চাষের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বিশেষ করে খামারের অনেক জমিতে বেলে মাটির আধিক্য থাকায় কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া যেত না। ২০২২ সালে বেলে মাটির সঙ্গে এটেল মাটির সংমিশ্রণ এবং নিয়মিত জৈব সার ও ধইঞ্চা ব্যবহারের ফলে জমির গুণগত মান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে বর্তমানে আলু ছাড়াও বোরো, আউশ ও আমন ধানের ভিত্তি বীজ উৎপাদনে ভালো ফলন পাওয়া যাচ্ছে।
উপ-পরিচালক কৃষিবিদ আবু তালেব মিঞা দায়িত্ব গ্রহণের পর খামারের পতিত জমিগুলোকে ধীরে ধীরে চাষাবাদের আওতায় আনা হয়। এখন খামারটিতে সারা বছর বিভিন্ন মৌসুমভিত্তিক ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা হচ্ছে।
জানতে চাইলে ডোমার ভিত্তি বীজ আলু উৎপাদন খামারের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ আবু তালেব মিঞা বলেন, “চলতি উৎপাদন মৌসুমে প্রায় ৫০০ একর জমিতে ভিত্তি বীজ আলু ও ব্রিডার বীজ আলু উৎপাদন করা হয়েছে। আলু উত্তোলনের পর জমিগুলো পতিত না রেখে প্রতি বছর সবুজ সার হিসেবে ধইঞ্চা চাষ করা হচ্ছে। ধইঞ্চা মাটির উর্বরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি পুষ্টি ধারণ ক্ষমতা ও পানিধারণ ক্ষমতা বাড়ায়। এছাড়া মাটির গঠন ও বুনট উন্নত করে, যা পরবর্তী ফসলের জন্য অত্যন্ত উপকারী।”
তিনি আরও বলেন, “ধইঞ্চা গাছ মাটিতে মিশে যাওয়ার পর প্রতি হেক্টরে প্রায় ৯০ থেকে ১২০ কেজি নাইট্রোজেন সরবরাহ করে, যা প্রায় ২০০ থেকে ২২০ কেজি ইউরিয়া সারের সমতুল্য। ফলে পরবর্তী ফসল উৎপাদনে ইউরিয়া সারের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। দীর্ঘমেয়াদে এটি মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা, উৎপাদন খরচ কমানো এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।”
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও অতিরিক্ত রাসায়নিক সারের ব্যবহারের কারণে দেশের অনেক এলাকার মাটির উর্বরতা কমে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ধইঞ্চার মতো সবুজ সার ব্যবহারের উদ্যোগ টেকসই কৃষি ব্যবস্থাপনার একটি কার্যকর উদাহরণ। এটি মাটির জৈব উপাদান বৃদ্ধি করার পাশাপাশি রোগবালাই ও আগাছার আক্রমণও কমাতে সাহায্য করে।
বিএডিসি সূত্রে জানা গেছে, ডোমার ও দেবীগঞ্জ খামার মিলিয়ে মোট ৬০১ একর আবাদযোগ্য জমি রয়েছে। এর মধ্যে ২১১ একর জমিতে আউশ ধান, ২০০ একরে ধইঞ্চা এবং অবশিষ্ট জমিতে আমন ধানের আবাদ করা হবে। উৎপাদিত ফসলের অধিকাংশই ভিত্তি বীজ হিসেবে সংরক্ষণ ও বিতরণ করা হবে, যা দেশের কৃষকদের কাছে উন্নতমানের বীজ সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পতিত জমিকে উৎপাদন ব্যবস্থার আওতায় এনে এবং ধইঞ্চার মতো সবুজ সার ব্যবহারের মাধ্যমে ডোমার বিএডিসি খামার এখন টেকসই ও পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থাপনার একটি সফল মডেলে পরিণত হয়েছে।
এর সুফল ভবিষ্যতে দেশের বীজ উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।