শিক্ষকতাকে মেধাবীদের প্রথম পছন্দ করতে সংস্কারের উদ্যোগ: প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক:

শিক্ষকতা যেন কেবল জীবিকার তাগিদে বেছে নেওয়া কোনো বিকল্প পেশা না হয়, বরং দেশের সবচেয়ে মেধাবী ও যোগ্য তরুণদের কাছে এটি যেন কর্মজীবনের প্রথম পছন্দ হয়ে ওঠে—এ লক্ষ্যেই শিক্ষা খাত ও শিক্ষক নিয়োগ ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

তিনি বলেন, শিক্ষকদের সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিও গভীরভাবে সম্পৃক্ত। সমাজে শিক্ষকের অবস্থান যত শক্তিশালী হবে, রাষ্ট্রের মর্যাদাও তত বাড়বে।

সোমবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত জাতীয় পর্যায়ের ‘গুণী শিক্ষক সম্মাননা’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচিত শিক্ষকদের সম্মাননা দেওয়া হয়।

বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে দেশের সব পর্যায়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একজন শিক্ষকের দায়িত্ব শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

তিনি বলেন, পরিবারের গণ্ডি পেরিয়ে একজন শিক্ষার্থীর সামনে শিক্ষকই হয়ে ওঠেন অন্যতম প্রধান আদর্শ। তাই শিক্ষকের ব্যক্তিত্ব, জ্ঞান ও আচরণ শিক্ষার্থীর ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। এ কারণে শিক্ষকদের আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সামনে রোল মডেল হিসেবে দাঁড়ানোর উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে সরকার কাজ করছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারের এই সময়ে শুধু প্রচলিত পদ্ধতিতে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীদের কারিগরি ও ব্যবহারিক জ্ঞানে দক্ষ করে তুলতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষাদান ও শেখার কৌশল পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাঠ্যক্রমও আধুনিক করা প্রয়োজন।

তিনি জানান, বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন পাঠ্যক্রম প্রণয়ন করা হয়েছে। চলতি বছরের মধ্যেই শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন পাঠ্যক্রমের বই পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের মুখস্থনির্ভর শিক্ষা থেকে বের করে আনতে শিক্ষক ও অভিভাবকদের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীদের শুধু তথ্য মুখস্থ করানোর পরিবর্তে কোনো বিষয় ‘কেন’ এবং ‘কীভাবে’—এ ধরনের প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করতে হবে। শিক্ষার্থীর মধ্যে অনুসন্ধিৎসা ও কৌতূহল তৈরি করা গেলে সে নিজেই জ্ঞান অর্জনের পথে এগিয়ে যেতে পারবে।

তিনি বলেন, আনন্দের মাধ্যমে শেখানোর ধারণা বিশ্বজুড়েই জনপ্রিয় হচ্ছে। বাংলাদেশেও ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ নামে নতুন একটি বই দেওয়া হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্যও এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

শিক্ষাব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তি জ্ঞান অর্জনের সুযোগকে অনেক বিস্তৃত করেছে। ফলে শুধু সার্টিফিকেটনির্ভর শিক্ষা নয়, বাস্তব জীবনে কাজে লাগে এমন দক্ষতা অর্জনের ওপর জোর দিতে হবে। শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সময়ের চাহিদা অনুযায়ী আধুনিক করা জরুরি।

তবে প্রযুক্তিকে শিক্ষকের বিকল্প হিসেবে বিবেচনা না করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, প্রযুক্তি শিক্ষকের কাজকে আরও কার্যকর করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে। এ লক্ষ্যেই ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

এই কর্মসূচির আওতায় শিক্ষকরা ট্যাবের মাধ্যমে ডিজিটাল পাঠ পরিকল্পনা, প্রশ্নব্যাংক, শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং বিভিন্ন শিক্ষণ উপকরণ ব্যবহার করতে পারবেন বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি বিনা মূল্যে ওয়াই-ফাই সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে কোনো শিশু শিক্ষা থেকে বাদ পড়বে না। কোনো শিক্ষার্থী মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দিলেও যাতে জীবনে বেকার হয়ে না থাকে, সে জন্য কর্মমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ তৈরি করতে হবে।

শিক্ষা খাতকে সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার উল্লেখ করে তিনি বলেন, জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এই খাতে বরাদ্দ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে বর্তমানে প্রায় ২১ হাজার মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে তিন লাখের বেশি শিক্ষক এক কোটিরও বেশি শিক্ষার্থীকে পাঠদান করছেন। এর বড় একটি অংশ বেসরকারি ও এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল।

শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুযোগের ব্যবধান কমানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাও যেন দক্ষ শিক্ষক, আধুনিক প্রযুক্তি ও মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়, সে বিষয়ে সরকার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে।

শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারে সরকারের মূল লক্ষ্য হিসেবে সমান সুযোগ, মানসম্মত শিক্ষা এবং বৈষম্যহীন প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল চাকরি পাওয়া নয়। একজন মানুষের নৈতিক ও চারিত্রিক বিকাশও শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নৈতিকতার সঙ্গে জ্ঞান যুক্ত না হলে সেই জ্ঞান সমাজের কল্যাণের পরিবর্তে ক্ষতির কারণ হতে পারে।

সত্যবাদিতা, দায়িত্ববোধ, মানবিকতা, সহমর্মিতা, দেশপ্রেম, শৃঙ্খলা এবং অন্যের প্রতি সম্মান—এসব মূল্যবোধ শিক্ষার্থীদের মধ্যে গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিবারের পর শিক্ষকরাই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে পারেন।

শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শিক্ষকতা পেশাকে আরও আকর্ষণীয় ও প্রতিযোগিতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আনতে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া ও শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্বিন্যাস করার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী।

রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে শিক্ষকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার উদ্যোগের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবসসহ বিভিন্ন জাতীয় দিবসে রাষ্ট্রীয়ভাবে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। চলতি বছর থেকে নীতিমালার ভিত্তিতে এসব অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে অন্তত একজন করে শিক্ষককে আমন্ত্রণ জানানোর নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, একজন শিক্ষক চাকরিতে থাকুন কিংবা অবসর নিন—শিক্ষকতা পেশায় থাকার কারণে রাষ্ট্রের কাছে তাঁর সম্মান আজীবন অটুট থাকবে।

শিক্ষকদের বেতন ও অবসরভাতা পেতে হয়রানি বন্ধের নির্দেশনার কথাও জানান তিনি। তাঁর মতে, প্রাপ্য অর্থের জন্য কোনো শিক্ষককে যেন বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরতে না হয়। যথাসময়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে তাঁদের পাওনা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।