আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা, রাজনীতির নতুন সমীকরণে বিএনপি-জামায়াতের পরীক্ষা

এস আই খান:

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ডিসেম্বর আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মাস হিসেবে সামনে আসছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়া আওয়ামী লীগ, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় ফেরা বিএনপি এবং সংসদে উল্লেখযোগ্য শক্তি হিসেবে আবির্ভূত জামায়াতে ইসলামী—এই তিন রাজনৈতিক শক্তিকে ঘিরেই তৈরি হচ্ছে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন, ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের যে ঘোষণা ও আলোচনা চলছে, তা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে এবং এর ফলে বিএনপি সরকার ও জামায়াতের রাজনীতিতে কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।

শেখ হাসিনা নিজেই জবঁঃবৎং-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফেরার এবং আদালতের কাছে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, গ্রেপ্তার বা অন্য কোনো পরিণতির আশঙ্কা থাকলেও তিনি দেশে ফিরতে চান। কিন্তু রাজনৈতিক ঘোষণা আর বাস্তব রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন এক বিষয় নয়। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম বর্তমানে নিষিদ্ধ এবং দলটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন পর্যায়ে মামলা ও বিচারপ্রক্রিয়া চলমান। ফলে ডিসেম্বরের প্রত্যাবর্তনকে শুধু একজন নেত্রীর দেশে ফেরার ঘটনা হিসেবে দেখলে বাংলাদেশের রাজনীতির প্রকৃত চিত্র ধরা পড়বে না। এটি একই সঙ্গে একটি দলের ভবিষ্যৎ, বিচারপ্রক্রিয়া, রাজনৈতিক অধিকার এবং রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের সক্ষমতার প্রশ্ন।
এখানেই আওয়ামী লীগের সামনে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার পর ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দলটির ক্ষমতার অবসান ঘটে। পরবর্তী সময়ে দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রম বিপর্যস্ত হয়েছে এবং বহু নেতা আত্মগোপনে, কারাগারে অথবা দেশের বাইরে রয়েছেন। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষণগুলোও দেখাচ্ছে, আওয়ামী লীগের বর্তমান সংকট কেবল ক্ষমতা হারানোর সংকট নয়; সাংগঠনিক কাঠামো, নেতৃত্বের বিকল্প ব্যবস্থা এবং জনসমর্থন পুনর্গঠনের প্রশ্নও দলটির সামনে বড় হয়ে উঠেছে।
অতএব ডিসেম্বরের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনকে আওয়ামী লীগের জন্য রাজনৈতিক পুনর্জন্ম হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। আবার এটিকে সম্পূর্ণ অসম্ভব বলেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস দেখায়, বড় রাজনৈতিক দল পরাজিত হওয়ার পরও নতুন বাস্তবতায় নিজেদের পুনর্গঠন করেছে। আওয়ামী লীগও অতীতে দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থেকে ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় ফিরেছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি অতীতের সঙ্গে এক নয়। এবার দলটির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ, বিচারপ্রক্রিয়া, রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি—সবকিছু একসঙ্গে কাজ করছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন বলতে আসলে কী বোঝানো হচ্ছে। শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন—এটি একটি বিষয়। আওয়ামী লীগ আবার সাংগঠনিকভাবে রাজনীতি করবে—এটি দ্বিতীয় বিষয়। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে—তৃতীয় বিষয়। আর জনগণের ভোটে পুনরায় রাষ্ট্রক্ষমতায় আসবে—চতুর্থ বিষয়। এই চারটি বিষয়কে এক করে দেখলে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ বিভ্রান্তিকর হয়ে যায়।
বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগকে আবার রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হবে না এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ, গুম ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ থাকবে না। অর্থাৎ ডিসেম্বরের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের সামনে প্রথম বাধা রাজনৈতিক নয়, আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক।
এখানে বিএনপি সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে। নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত ফলাফলে বিএনপির ২০৭টি আসন এবং জামায়াতের ৬৮টি আসন পাওয়ার তথ্য রয়েছে। ফলে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন এখন এমন একটি সরকারের সামনে প্রশ্ন তৈরি করছে, যে সরকার নিজেই একসময় আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রধান শক্তি ছিল।
বিএনপির জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হবে আইন, গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার বিচার হবে আদালতে, রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থাকলে তার আইনি ভিত্তি স্পষ্ট থাকতে হবে এবং রাজনৈতিক অধিকার সীমিত হলে তার সাংবিধানিক ও আইনগত ব্যাখ্যাও জনগণের সামনে পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন। কারণ একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা কিংবা কোনো দলের রাজনৈতিক কার্যক্রম সীমিত করার সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
বিএনপি যদি আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নকে কেবল দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার দৃষ্টিতে দেখে, তাহলে বিষয়টি আরও জটিল হতে পারে। আবার বিএনপি যদি বিচারপ্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নকে আলাদা করে দেখে, তাহলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা তৈরির সুযোগ থাকবে। রাজনীতির প্রকৃত পরীক্ষা এখানেই।
বিএনপির সামনে আরও একটি বাস্তবতা রয়েছে। দীর্ঘ আন্দোলনের পর ক্ষমতায় এসে দলটির কাছে জনগণের প্রত্যাশা এখন অনেক বেশি। ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি সরকারের সামনে প্রশাসনিক সংস্কার, আইনশৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক চাপ কমানো এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার মতো বিষয়গুলো বড় হয়ে উঠেছে। ফলে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য রাজনৈতিক তৎপরতা মোকাবিলা করতে গিয়ে যদি সরকারের মূল প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচি আড়ালে পড়ে যায়, তাহলে সেটিও সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক সমস্যা তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীও বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অবস্থানে এসেছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনে দলটি ৬৮টি আসন পেয়েছে বলে নির্বাচন কমিশনের ফলাফলে উল্লেখ রয়েছে। ফলে জামায়াত এখন কেবল রাজপথের একটি রাজনৈতিক শক্তি নয়; সংসদীয় রাজনীতিতেও তার একটি দৃশ্যমান অবস্থান তৈরি হয়েছে।
এখানে বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচনের আগে বিএনপি নেতৃত্ব জামায়াতের সঙ্গে ঐক্য সরকার গঠনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল এবং জামায়াতকে সম্ভাব্য বিরোধী শক্তি হিসেবে দেখার কথা জানিয়েছিল। নির্বাচনের পর সেই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। অর্থাৎ বিএনপি ও জামায়াত এখন একই রাজনৈতিক পরিসরের অংশ হলেও তারা একই রাজনৈতিক লক্ষ্য বা কৌশলের অভিন্ন প্রতিনিধি নয়।
আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন এই দুই দলের সম্পর্ককে নতুন পরীক্ষার সামনে দাঁড় করাতে পারে। আওয়ামী লীগকে কীভাবে মোকাবিলা করা হবে—এ প্রশ্নে বিএনপি ও জামায়াতের অবস্থান অনেক ক্ষেত্রে কাছাকাছি হতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা, সংবিধান সংস্কার, অর্থনীতি, প্রশাসন, সামাজিক নীতি এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনী কৌশল নিয়ে তাদের মধ্যে পার্থক্যও রয়েছে। ফলে আওয়ামী লীগ প্রশ্নে সাময়িক ঐকমত্য থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমীকরণ একই থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জনগণকে নিয়ে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা জামায়াত—কোনো রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যৎ কেবল দলীয় কৌশল দিয়ে নির্ধারিত হওয়ার কথা নয়। শেষ পর্যন্ত জনগণের আস্থা, রাজনৈতিক কর্মসূচি, সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপরই দলগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনকে সামনে এনেছে—জনগণ রাজনৈতিক জবাবদিহি দাবি করতে পারে এবং ক্ষমতার দীর্ঘস্থায়িত্বকে স্বয়ংক্রিয় বৈধতা হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য নয়।
আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই হবে—দলটি কি অতীতের রাজনৈতিক কাঠামো নিয়েই ফিরতে চায়, নাকি নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করবে? দীর্ঘ শাসনের সময় যেসব সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, সেসব বিষয়ে আত্মসমালোচনা ও সাংগঠনিক সংস্কার ছাড়া শুধু পুরোনো স্লোগান দিয়ে রাজনৈতিক জায়গা পুনরুদ্ধার করা কঠিন হতে পারে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও দলটির জন্য জনসমর্থন পুনর্গঠন ও নতুন নেতৃত্ব তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে।
আবার বিএনপির জন্যও আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। নির্বাচনে বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা কোনো সরকারের জন্য চূড়ান্ত রাজনৈতিক সাফল্যের সনদ নয়। বরং বড় ম্যান্ডেটের সঙ্গে বড় দায়িত্বও আসে। বিএনপিকে প্রমাণ করতে হবে যে ক্ষমতার পরিবর্তন শুধু ক্ষমতাধর রাজনৈতিক দলের পরিবর্তন নয়; রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতিরও পরিবর্তন। প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন, বিচারব্যবস্থা এবং দুর্নীতি দমন—প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব কমানো না গেলে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা পূরণ হবে না।
জামায়াতের জন্যও চ্যালেঞ্জ কম নয়। সংসদে ৬৮টি আসন দলটিকে দৃশ্যমান রাজনৈতিক শক্তি করেছে। কিন্তু সংসদীয় শক্তি বৃদ্ধি মানেই জনগণের সব অংশের আস্থা অর্জন নয়। জামায়াতকে এখন সংসদীয় রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান, অর্থনৈতিক কর্মসূচি, সামাজিক নীতি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান আরও দৃশ্যমান করতে হবে। একই সঙ্গে বিরোধী দল হিসেবে সরকারের সমালোচনা এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থে গঠনমূলক ভূমিকার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ।
ডিসেম্বর তাই কেবল আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের মাস নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য একটি পরীক্ষার সময়। শেখ হাসিনা সত্যিই দেশে ফিরবেন কি না, ফিরলে কীভাবে ফিরবেন, আদালত কী সিদ্ধান্ত নেবে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞার ভবিষ্যৎ কী হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো নিশ্চিত নয়। তাঁর দেশে ফেরার আইনি প্রক্রিয়া নিয়েও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। একইভাবে কোনো রাজনৈতিক দলকে কেবল অতীতের পরিচয়ের কারণে ভবিষ্যৎ রাজনীতির একমাত্র দাবিদারও বানানো যায় না। রাজনীতি শেষ পর্যন্ত জনগণের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়। যে দল জনগণের আস্থা হারায়, তাকে তার কারণ ব্যাখ্যা করতে হয়; যে দল নতুন করে আস্থা পেতে চায়, তাকে নতুন রাজনৈতিক ভাষা ও কর্মসূচি নিয়ে সামনে আসতে হয়।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন প্রতিহিংসার রাজনীতি নয়, জবাবদিহির রাজনীতি। অপরাধের বিচার হবে আইনের মাধ্যমে, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে ভোটের মাধ্যমে এবং রাষ্ট্র পরিচালনা হবে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে—এই তিনটি নীতি প্রতিষ্ঠিত না হলে ক্ষমতার পালাবদল কেবল মুখ বদলাবে, রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলাবে না।
ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন তাই বিএনপির জন্য যেমন রাজনৈতিক পরীক্ষা, জামায়াতের জন্যও তেমনি সাংগঠনিক ও সংসদীয় পরীক্ষা। আর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র কি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিচার করতে গিয়ে রাজনৈতিক স্বাধীনতার সীমা অতিক্রম করবে, নাকি আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগের মাধ্যমে একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে—তার উত্তরই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রাজনৈতিক চরিত্র নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
আজকের বাংলাদেশে জনগণ আর শুধু জানতে চায় না কে ক্ষমতায় যাবে। জনগণ জানতে চায় ক্ষমতায় গিয়ে কে কী করবে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কতটা স্বাধীন থাকবে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কতটা বাস্তব হবে, রাজনৈতিক সহিংসতা কতটা কমবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কতটা পরিবর্তন আসবে।
সুতরাং ডিসেম্বরের দিকে তাকিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত নিজেদের জয়-পরাজয়ের হিসাবের চেয়ে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবা। আওয়ামী লীগ যদি ফিরতে চায়, তাকে অতীতের প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। বিএনপি ক্ষমতায় থেকে প্রমাণ করতে হবে যে তারা কেবল আওয়ামী লীগের বিকল্প নয়, বরং একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার নির্মাতা হতে চায়। আর জামায়াতকে প্রমাণ করতে হবে যে সংসদীয় শক্তি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে গণতান্ত্রিক জবাবদিহি ও রাষ্ট্রীয় নীতিতে তাদের ভূমিকারও পরিপক্বতা এসেছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ডিসেম্বরের সম্ভাব্য উত্তাপ তাই কোনো এক দলের প্রত্যাবর্তনের গল্প নয়। এটি আসলে পুরোনো রাজনীতি বনাম নতুন রাজনৈতিক প্রত্যাশার পরীক্ষা। জনগণ হয়তো আর শুধু সরকার পরিবর্তন চায় না; তারা চায় রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন। সেই পরিবর্তন যদি না আসে, তবে ক্ষমতার মসনদ বদলালেও রাষ্ট্রের মৌলিক সংকট থেকে যাবে।
শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের বিচারে কোনো দলই চিরস্থায়ী নয়। ক্ষমতা আসে, ক্ষমতা যায়। কিন্তু রাষ্ট্র থেকে যায়, জনগণ থেকে যায়, গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা থেকে যায়। তাই ডিসেম্বরের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আওয়ামী লীগ ফিরবে কি না—এটি নয়। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতসহ দেশের সব রাজনৈতিক শক্তি কি অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হবে, যেখানে ক্ষমতার চেয়ে জনগণের অধিকার বড় হবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সেই উত্তরটির ওপরই নির্ভর করছে।