বিআইডব্লিউটিসি’র বাণিজ্য পরিচালক আশিকুজ্জামানের দুর্নীতির খতিয়ান নিয়োগ বাণিজ্য, ভুয়া বিল ও কোটি টাকার ইজারা লোপাট

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা:

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্পোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি)-এর এখন দুর্নীতির এক নিরাপদ আখড়ায় পরিণত হয়েছে। আর এই দুর্নীতির সাম্রাজ্যের মূল হোতা হিসেবে আঙুল উঠেছে সংস্থাটির প্রভাবশালী পরিচালক (বাণিজ্য) এস এম আশিকুজ্জামান-এর দিকে। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার অপব্যবহার, পদোন্নতি জালিয়াতি, ঠিকাদার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি রাজস্ব আত্মসাতের মাধ্যমে তিনি গড়ে তুলেছেন কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের পাহাড়। সম্প্রতি তাঁর এই নজিরবিহীন দুর্নীতির খতিয়ান আমলে নিয়ে দেশের সর্বোচ্চ দুর্নীতি বিরোধী সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাকে তলব করেছে এবং তার ও তার স্ত্রী ফারজানা হকের নামে থাকা দেশ-বিদেশের বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান শুরু করেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিআইডব্লিউটিসি-এর অভ্যন্তরে এমন কোনো খাত নেই যেখানে এস এম আশিকুজ্জামান দুর্নীতির জাল বিস্তার করেননি। সম্প্রতি সম্পন্ন হওয়া প্রায় ৬০০টি অস্থায়ী পদের নিয়োগ জালিয়াতি থেকে শুরু করে, ‘এসটি জব্বার’ ও ‘এমভি আইভি রহমান’ জাহাজের ভুয়া মেরামত বিল এবং পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া রুটের শত কোটি টাকার টিকিট ব্যবস্থাপনা ও ইজারা জালিয়াতিতে তাঁর সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে।

এস এম আশিকুজ্জামানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় এবং আলোচিত অভিযোগ হলো বিআইডব্লিউটিসি-তে সম্প্রতি সম্পন্ন হওয়া প্রায় ৬০০টি অস্থায়ী পদের নিয়োগে নজিরবিহীন দুর্নীতি ও অনিয়ম। সংস্থার একাধিক গোপন সূত্র এবং ভুক্তভোগীদের দাবি, এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের স্বচ্ছতা বা সরকারি বিধিমালার তোয়াক্কা করা হয়নি। সম্পূর্ণ মেধার কবর দিয়ে প্রতিটি পদের বিপরীতে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়েছে। আশিকুজ্জামানের নিজস্ব একটি সিন্ডিকেট এই নিয়োগ বাণিজ্য সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করেছে। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় অযোগ্য প্রার্থীদের পাস করিয়ে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে যোগ্য ও প্রকৃত প্রার্থীরা বাদ পড়েছেন। এই বিশাল নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া কোটি কোটি টাকার বড় অংশই আশিকুজ্জামানের পকেটে গেছে বলে দাবী অভিযোগকারীদের। এই সুনির্দিষ্ট নিয়োগ কেলেঙ্কারির কারণেই দুদক তাঁকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নোটিশ পাঠিয়েছে।

সরকারি জাহাজের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের নামে বিআইডব্লিউটিসি-তে কীভাবে অর্থ লোপাট হয়, তার বাস্তব উদাহরণ হলো ‘এসটি জব্বার’ এবং ‘এমভি আইভি রহমান’ নামক দুটি জাহাজ। বাণিজ্যিক পরিচালক হিসেবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে আশিকুজ্জামান কারিগরি বিভাগকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এই দুটি জাহাজের মেরামত ও সংস্কার কাজের বিপরীতে কোটেশন ও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নজিরবিহীন কারচুপি করেছেন। কোনো ধরনের উন্মুক্ত এবং প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই তাঁর নিজস্ব লাইসেন্সধারী ঠিকাদারদের কোটেশনের মাধ্যমে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সরেজমিনে জাহাজের কোনো বাস্তব সংস্কার কাজ না করেই শতভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে দেখিয়ে ভুয়া বিল ও ভাউচার তৈরি করা হয়েছে। নিয়মনীতি লঙ্ঘন করে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ফাইল পাস করিয়ে সরকারি তহবিল থেকে কোটি কোটি টাকা ছাড় দেওয়া হয়েছে, যার সিংহভাগই এই সিন্ডিকেটের পকেটে গেছে।

বিআইডব্লিউটিসি-এর আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হলো পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ফেরি রুট। কিন্তু বিগত ৫ বছর ধরে এই রুটের টিকিট ব্যবস্থাপনা এবং ঘাট ইজারা সংক্রান্ত দরপত্র আহ্বান ও চুক্তির ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম ও রাজস্ব চুরির ঘটনা ঘটেছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিগত ৫ বছরে এই রুটে টিকিট বিক্রির স্বয়ংক্রিয় বা ম্যানুয়াল ব্যবস্থাপনায় ইচ্ছাকৃতভাবে ফাঁকফোকর রাখা হয়েছিল, যাতে দৈনিক মূল আদায়কৃত রাজস্বের একটি বড় অংশ সরকারি তহবিলে জমা না হয়ে আশিকুজ্জামান ও তাঁর অনুসারী সিন্ডিকেটের পকেটে যায়। এছাড়া ঘাট ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দরদাতাকে বঞ্চিত করে নামমাত্র মূল্যে পছন্দের সংস্থাকে ইজারা দিয়ে চুক্তিনামা সই করা হয়েছে। এর ফলে বিগত ৫ বছরে সরকার এই খাত থেকে শত কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব হারিয়েছে, যা সরাসরি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হওয়ার কথা ছিল।

এস এম আশিকুজ্জামানের এই ক্ষমতার উৎস এবং দুর্নীতির শুরু কিন্তু একদিনে হয়নি। দুদকের নথিতে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালে তিনি বিআইডব্লিউটিসির এজিএম ফিডার পদে দুই বছর পূর্ণ না করেই সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূতভাবে ডিজিএম (সাময়িক) পদে পদোন্নতি বাগিয়ে নেন। অথচ বিআইডব্লিউটিসির কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রবিধানমালায় এই সাময়িক পদোন্নতির কোনো অস্তিত্বই নেই। পরবর্তীতে ২০১৮ এবং ২০২১ সালে রাজনৈতিক প্রভাব ও অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার বলয় ব্যবহার করে তিনি পরিচালক (বাণিজ্য) পদে আসীন হন এবং পুরো সংস্থার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেন। এই দীর্ঘ সময়ে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে তিনি ও তাঁর স্ত্রী ফারজানা হক ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে নামে-বেনামে একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, প্লট, বাণিজ্যিক দোকান এবং বিপুল পরিমাণ জমির মালিক হয়েছেন। দুদক বর্তমানে তাঁর এই স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির বিবরণ চেয়ে বিভিন্ন সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ও ব্যাংকে চিঠি পাঠিয়েছে।

বিআইডব্লিউটিসি-এর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সংস্থায় বসে এভাবে সরকারি তহবিল ও সম্পদ লুটে নেওয়ার ঘটনায় চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ কর্মকর্তা ও সচেতন নাগরিক সমাজ। তাদের মতে, শুধু তলব বা বদলিই যথেষ্ট নয়; আশিকুজ্জামান ও তাঁর দুর্নীতির দোসরদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং আত্মসাৎকৃত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফিরিয়ে আনতে হবে। দুদক সূত্রে জানা গেছে, তাঁর বিরুদ্ধে আনা প্রতিটি অভিযোগের নথিপত্র এবং ডিজিটাল প্রমাণাদি যাচাই করা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে খুব শীঘ্রই এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনে মামলা দায়ের করা হবে। বিআইডব্লিউটিসি-এর এই কালো অধ্যায়ের শেষ কোথায়, এখন সেটাই দেখার অপেক্ষায় দেশবাসী।