অন্যায়ের শিকার মানুষ ন্যায়বিচার চাইবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ন্যায়বিচারের পথ যখন বন্ধ হয়ে যায়, তখন ক্ষোভ কখনো কখনো মানুষকে প্রতিশোধের পথে ঠেলে দেয়। আর সেই প্রতিশোধ যখন সহিংসতায় রূপ নেয়, তখন একজন নির্যাতিত মানুষও ধীরে ধীরে এমন এক বাস্তবতায় প্রবেশ করতে পারেন, যেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন। ভারতের আলোচিত ও বিতর্কিত চরিত্র ফুলন দেবীর জীবন এরই এক জটিল ও বেদনাদায়ক দৃষ্টান্ত।
ফুলন দেবীর জন্ম ১৯৬৩ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশের একটি দরিদ্র পরিবারে। নিম্নবর্ণের পরিবারে জন্ম নেওয়ায় ছোটবেলা থেকেই তিনি দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য, বাল্যবিয়ে ও নানা ধরনের নিপীড়নের মুখোমুখি হন। অল্প বয়সেই তাঁর বিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে স্বামীর সংসার ছেড়ে তিনি পরিবারের কাছে ফিরে আসেন। এরপর জমি ও সামাজিক বিরোধকে কেন্দ্র করে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর পরিবারের বিরোধ তৈরি হয়। বিভিন্ন বর্ণনায় তাঁর জীবনের এই সময়টিকে অপমান, নিপীড়ন ও অনিশ্চয়তায় ভরা সময় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
এরপর ফুলন দেবীর জীবনে আসে আরও ভয়াবহ অধ্যায়। ১৯৭৯ সালের দিকে তিনি দস্যুদের একটি দলের হাতে অপহৃত হন এবং যৌন নির্যাতনের শিকার হন। পরবর্তী সময়ে দলের আরেক সদস্য বিক্রম মল্লাহ তাঁকে ওই নির্যাতন থেকে রক্ষা করেন বলে বিভিন্ন জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে। বিক্রমের সঙ্গে তিনি দস্যু দলে জীবনযাপনে জড়িয়ে পড়েন এবং সেখানেই অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ নেন। তবে তাঁর জীবনের এসব ঘটনার বিবরণ নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে পার্থক্য রয়েছে। ফলে ফুলন দেবীর জীবনকে শুধু একটি সরল ধারাবাহিকতায় বিচার করা কঠিন।
১৯৮০ সালে বিক্রম মল্লাহ নিহত হওয়ার পর ফুলন দেবীর জীবনে আবার বড় পরিবর্তন আসে। প্রতিদ্বন্দ্বী দস্যু দলের সঙ্গে সংঘাত এবং বিক্রমের মৃত্যুর প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা তাঁকে আরও গভীরভাবে দস্যু জীবনে ঠেলে দেয়। এরপর তিনি নিজেই একটি দস্যু দলের নেতৃত্বে উঠে আসেন। তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে চম্বল উপত্যকাজুড়ে। কেউ তাঁকে ভয়ংকর দস্যু হিসেবে দেখেছে, আবার নিম্নবর্ণের দরিদ্র মানুষের একটি অংশ তাঁকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবেও দেখেছিল। এখান থেকেই তাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে যায় ডাকু রানী।
কিন্তু ফুলন দেবীর জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় হলো বেহমাই হত্যাকাণ্ড। ১৯৮১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বেহমাই গ্রামে ২২ জন পুরুষকে গুলি করা হয় এবং তাঁদের মধ্যে ২০ জন নিহত হন। ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। ফুলন দেবীর জীবনে আগে সংঘটিত নির্যাতন এবং বেহমাইয়ের কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে সেই ঘটনার সম্পর্ককে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ডটিকে অনেকে প্রতিশোধ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তবে এই হত্যাকাণ্ডের দায় ও ফুলন দেবীর প্রত্যক্ষ ভূমিকা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। পরবর্তী সময়ে তিনিও হত্যাকাণ্ডের স্থানে থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ আছে।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার। একজন মানুষ যত ভয়াবহ অন্যায়ের শিকারই হোন না কেন, সেই অন্যায়ের প্রতিশোধ হিসেবে অন্য মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়া ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। এতে একটি অন্যায়ের জায়গায় আরেকটি অন্যায় তৈরি হয়। একজনের ওপর সংঘটিত নির্যাতনের প্রতিশোধ যখন অন্য নিরপরাধ বা সংশ্লিষ্ট মানুষের জীবনেও আঘাত হানে, তখন প্রতিশোধ আর ন্যায়বিচারের সীমার মধ্যে থাকে না।
বেহমাইয়ের ঘটনার পর ফুলন দেবী দীর্ঘদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ এড়িয়ে চলেন। তাঁকে ধরতে ব্যাপক অভিযান চালানো হয়। অবশেষে দীর্ঘ আলোচনা ও সমঝোতার পর ১৯৮৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রদেশের ভিন্দে তিনি আত্মসমর্পণ করেন। হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে মধ্যপ্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী অর্জুন সিংয়ের সামনে ফুলন দেবী তাঁর অস্ত্র জমা দেন। তাঁর আত্মসমর্পণের সঙ্গে কিছু শর্তও যুক্ত ছিল। তিনি মৃত্যুদণ্ড না দেওয়া, হাতকড়া না পরানো, পরিবারের নিরাপত্তা এবং কারাবাসের বিষয়ে নানা নিশ্চয়তা চেয়েছিলেন। যা ভারত সরকার তাকে গ্রেফতারের স্বার্থে মেনে নিয়েছিলেন এমন তথ্য আছে।
আত্মসমর্পণের পর ফুলন দেবী দীর্ঘ সময় কারাগারে ছিলেন। প্রায় ১১ বছর পর ১৯৯৪ সালে তিনি মুক্তি পান। এরপর তাঁর জীবনে আসে আরেক নাটকীয় পরিবর্তন। যে নারী একসময় ভারতের অন্যতম আলোচিত দস্যু হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তিনিই পরে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৯৬ সালে উত্তর প্রদেশের মির্জাপুর থেকে লোকসভা সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ১৯৯৯ সালেও তিনি পুনর্নির্বাচিত হন। অর্থাৎ তাঁর জীবন শুধু অপরাধ, প্রতিশোধ ও দস্যুতার গল্প নয়, এটি সামাজিক বৈষম্য, রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থা, কারাবাস, রাজনৈতিক পুনর্বাসন এবং ক্ষমতার রাজনীতিরও এক জটিল অধ্যায়।
ফুলন দেবীর জীবন নিয়ে দেশ বিদেশে বই, প্রামাণ্যচিত্র ও চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। লেখিকা মালা সেনের লেখা ‘ভারতের দস্যু রানী: ফুলন দেবীর সত্য কাহিনি’ বইটি তাঁর জীবনকে আন্তর্জাতিকভাবে আরও পরিচিত করে। ১৯৯৪ সালে পরিচালক শেখর কাপুর নির্মাণ করেন ‘দস্যু রানী’ চলচ্চিত্র, যা ফুলন দেবীর জীবনকাহিনির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। চলচ্চিত্রটি তাঁকে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছেও পরিচিত করে তোলে। ফুলন দেবীকে নিয়ে আরও প্রামাণ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে, যেখানে তাঁর দস্যু জীবন, নির্যাতনের অভিজ্ঞতা, আত্মসমর্পণ ও রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে।
তবে ‘দস্যু রানী’ চলচ্চিত্র নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। ফুলন দেবী নিজেই চলচ্চিত্রে তাঁর জীবনের যৌন নির্যাতনের উপস্থাপন নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। অর্থাৎ তাঁর জীবনের গল্প নিয়ে শুধু দর্শকের আগ্রহই তৈরি হয়নি, একজন নির্যাতিত নারীর ব্যক্তিগত যন্ত্রণা কিভাবে চলচ্চিত্রে উপস্থাপন করা হবে, তা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছিল।
কিন্তু গল্পের শেষটিও সুখকর হয়নি। ২০০১ সালের ২৫ জুলাই নয়াদিল্লিতে নিজের বাসভবনের সামনে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন ফুলন দেবী। একজন দরিদ্র ও নির্যাতিত নারী থেকে দস্যু, দস্যু থেকে কারাবন্দি এবং সেখান থেকে সংসদ সদস্য হয়ে ওঠার পরও শেষ পর্যন্ত সহিংসতার ছায়া তাঁর জীবন থেকে সরে যায়নি।
ফুলন দেবীর জীবন তাই শুধু একজন দস্যু নারীর গল্প নয়। এটি সমাজের জন্য একটি সতর্কবার্তা। অন্যায়কে প্রশ্রয় দিলে ক্ষোভ জমে। বিচার না পেলে মানুষ রাষ্ট্র ও সমাজের ওপর আস্থা হারাতে পারে। কিন্তু সেই ক্ষোভ যদি প্রতিশোধে রূপ নেয়, তাহলে তা আবার নতুন অন্যায়ের জন্ম দেয়।
ন্যায়বিচার আর প্রতিশোধ এক জিনিস নয়। ন্যায়বিচারের লক্ষ্য হলো অপরাধের বিচার করা এবং ভবিষ্যতে অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো। প্রতিশোধের লক্ষ্য হলো নিজের ক্ষোভ মেটানো। এই দুইয়ের পার্থক্য বুঝতে না পারলে সমাজে আইনের শাসনের জায়গায় শক্তির শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।
ফুলন দেবীর জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এখানেই। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে, কিন্তু অন্যায়ের পথ অনুসরণ করে নয়। নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হবে, কিন্তু প্রতিশোধের নামে আরেকটি নির্যাতন সৃষ্টি করা যাবে না। কারণ একজন মানুষের ওপর অন্যায় হয়েছে বলে তাকে অন্য মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার অধিকার কেউ দিতে পারে না।
আজও পৃথিবীর বিভিন্ন সমাজে মানুষ অন্যায়, বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার হন। তাঁদের ক্ষোভকে অবহেলা করা যেমন বিপজ্জনক, তেমনি সেই ক্ষোভকে সহিংস প্রতিশোধে পরিণত হতে দেওয়াও ভয়াবহ। তাই প্রতিটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা। সমাজের দায়িত্ব হলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকা এবং আইন নিজের হাতে তুলে না নেওয়া।
ফুলন দেবীর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অন্যায়ের আগুন থেকে ক্ষোভের জন্ম হতে পারে, ক্ষোভ থেকে প্রতিশোধের জন্ম হতে পারে, আর প্রতিশোধ শেষ পর্যন্ত আরও সহিংসতার জন্ম দিতে পারে। তাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর পথ প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার।
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র প্রতিশোধ নয়, আইন। আর সেই আইন যদি মানুষের আস্থা অর্জন করতে না পারে, তাহলে সমাজে ফুলন দেবীর মতো আরও বহু জটিল ও বেদনাদায়ক গল্পের জন্ম হতে পারে।
তথ্য উপাত্ত ইউকিপিডিয়া থেকে