চীনের সীমান্তবর্তী শহর দানদংয়ে দিনব্যাপী সফর শেষে শনিবার দেশে ফিরেছেন উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উন।
এ সময় দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে ‘দৃঢ়ভাবে এগিয়ে নেওয়ার’ অঙ্গীকার করেন তিনি।
উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এ তথ্য জানিয়েছে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।
গত সপ্তাহে চীন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃসীমান্ত সেতু আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়। নির্মাণ শেষ হওয়ার ১২ বছর পর সেতুটি চালু করা হলো। এর মধ্য দিয়ে কূটনৈতিকভাবে অনেকটা বিচ্ছিন্ন উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
কিমের এই সফরের বিষয়ে আগে থেকে কোনো ঘোষণা দেয়নি চীন বা উত্তর কোরিয়া।
উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সি (কেসিএনএ) জানায়, দানদংয়ে সফরকালে কিম ১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত কোরীয় যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার পক্ষে লড়াই করে নিহত চীনা সেনাদের স্মরণে নির্মিত একটি স্মৃতিসৌধ পরিদর্শন করেন।
পরে চীনের শীর্ষ রাজনৈতিক উপদেষ্টা ওয়াং হুনিংয়ের সঙ্গে কথা বলেন কিম। সফরকালে ওয়াং তার সঙ্গে ছিলেন।
উত্তর কোরিয়ার সরকারি নাম ডেমোক্রেটিক পিপলস রিপাবলিক অব কোরিয়ার সংক্ষিপ্ত রূপ ব্যবহার করে কিম বলেন, ‘চীনা জনগণের শ্রেষ্ঠ সন্তানরা আমাদের বিপ্লবে যে সহায়তা করেছিলেন, সেই ইতিহাস আমরা সব সময় স্মরণে রাখব। উত্তর কোরিয়া ও চীনের বন্ধুত্বের ইতিহাস আমরা ধারাবাহিকভাবে ও দৃঢ়তার সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাব।’
কিমের সফরের উদ্দেশ্য ও ফলাফল সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়নি। তবে চীন উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং দেশটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সহায়তার উৎস।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া এ তথ্য জানিয়েছে। ওয়াং হুনিং বলেছেন, দুই দেশের জনগণের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করা, রাজনৈতিক পারস্পরিক আস্থা বাড়ানো এবং সহযোগিতা ও উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এই সফরের গুরুত্ব রয়েছে।
ওয়াং এ সময় চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের পক্ষ থেকে কিমকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও শুভকামনা জানান।
১৯৫০ সালে কোরীয় যুদ্ধে চীনা সেনাদের অংশগ্রহণের বার্ষিকী পালনের সময়ের কাছাকাছি সময়ে এই সফর অনুষ্ঠিত হলো।
ওই যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জাতিসংঘ বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে কয়েক লাখ সেনা পাঠিয়েছিল চীন। এর ফলে উত্তর কোরিয়া পরাজয়ের হাত থেকে রক্ষা পায় ও দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ মৈত্রী গড়ে ওঠে।
সিনহুয়া জানায়, চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইও সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
স্মৃতিসৌধ পরিদর্শনের পর কিম একটি বাস তৈরির কারখানা ঘুরে দেখেন। এরপর তিনি উত্তর কোরিয়ায় ফিরে যান বলে কেসিএনএ জানিয়েছে।
শহরটির বাসিন্দা ঝাও এএফপিকে বলেন, কিমের সফর ‘বেশ ভালো’ হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তার আশা, দুই দেশের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হলে তা শেষ পর্যন্ত ডানডংয়ের মানুষেরও উপকারে আসবে।
৫০ বছর বয়সী এই গাড়িচালক বলেন, ‘দুই দেশ যখন পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়াবে, তখন স্বাভাবিকভাবেই চীনের সীমান্তবর্তী শহরগুলো অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের বন্ধুত্ব চিরকাল অটুট থাকুক।’
দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিউ ইয়ালু নদী সেতুর নির্মাণকাজ ২০১৪ সালে শেষ হয়েছিল। তবে উত্তর কোরিয়ার অংশে সংযোগ সড়ক ও শুল্কসংক্রান্ত অবকাঠামো না থাকায় সেতুটি চালু করতে বিলম্ব হয়।
উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার মধ্যে প্রথম সড়ক সেতু চালুর এক মাসের কিছু বেশি সময় পর চীন-উত্তর কোরিয়া সেতুটি চালু হলো।
দক্ষিণ কোরিয়ার ইউনিভার্সিটি অব নর্থ কোরিয়ান স্টাডিজের সাবেক প্রেসিডেন্ট ইয়াং মু-জিন এএফপিকে বলেন, এ বছরের শুরুতে সি চিন পিংয়ের উত্তর কোরিয়া সফরের সময় যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়নে চীনকে আরও দ্রুত পদক্ষেপ নিতে চাপ দেওয়ার উদ্দেশ্যেও কিমের এই সফর হয়ে থাকতে পারে।
তিনি আরও বলেন, চীনের শেনজেনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সম্ভাব্য শীর্ষ বৈঠকের আগে বেইজিংয়ের সক্রিয় সমর্থন ও সহযোগিতা চাওয়াও কিমের সফরের একটি উদ্দেশ্য হতে পারে।
শনিবারের সফরের খবর দক্ষিণ কোরিয়ার বার্তা সংস্থা ইয়োনহাপ প্রথম প্রকাশ করার কয়েক ঘণ্টা আগে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, পিয়ংইয়ংয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে কিম তার সামরিক বাহিনীকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বাহিনীতে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
কোরীয় ধাঁচের সামরিক বিপ্লব’ বলে অভিহিত উদ্যোগের মাধ্যমে সামরিক বাহিনীকে আরও শক্তিশালী করার জন্য কিমের এই আহ্বান এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দুই দেশের মধ্যে কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত অসামরিকীকৃত অঞ্চলে (ডিমিলিটারাইজড জোন— ডিএমজেড) বিস্ফোরণের ঘটনার পর উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে অভিন্ন সীমান্তের বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পেতে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী।
জাতিসংঘের দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও উত্তর কোরিয়া আইনগতভাবে নিজেকে পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। দেশটির সরকার নিয়মিতই বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার স্থায়ী এবং এ অবস্থান থেকে সরে আসার কোনো সুযোগ নেই।
দক্ষিণ কোরিয়ার তুলনামূলক সংলাপপন্থী প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং একাধিকবার কোনো পূর্বশর্ত ছাড়াই পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন।
গত সেপ্টেম্বরে তিনি প্রস্তাব করেন, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি অবিলম্বে পুরোপুরি বন্ধ করার পরিবর্তে আপাতত তা স্থগিত রাখার বিষয়ে ওয়াশিংটনের আলোচনা করা উচিত। এর বিনিময়ে উত্তর কোরিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা যেতে পারে।
সমালোচকদের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ উত্তর কোরিয়াকে কার্যত পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হিসেবে পরোক্ষ স্বীকৃতি দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার অক্ষত রেখেই নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সুবিধা পেতে পারে পিয়ংইয়ং।