আব্দুল্লাহ আল মামুন (ঢাকা ব্যুরো প্রধান):
পারিবারিক শিক্ষা ও বাবা-মায়ের আদর্শকে অবলম্বন করে সহজাত শান্ত স্বভাবের ও ঘরকুনো মেয়েটি শাহনাজ পারভীন আজ হয়ে উঠেছেন এক সফল উদ্যোক্তা।
আমাদের এই সমাজে একজন সফল উদ্যোক্তা হয়ে উঠা অতটা সহজ নয়। তার জন্য প্রয়োজন হয় প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও ধর্য্য। নারী উদ্যোক্তা হওয়ায় শত বাঁধা আর প্রতিকূলতার মধ্যেও দমে যায়নি শাহনাজ, নিরাশ হয়নি কখনো। ফলাফল, “নিত্যপণ্য সমাহারে আত্মবিশ্বাসী পথচলা” Shahnaj’s Collection।
শাহনাজের উদ্যোক্তা হওয়ার শুরুটা খুব একটা সুখকর ছিল না। পড়া-লেখায় মেধাবী না হওয়ায় নিজেকে খুব সাধারণ একটি মেয়ে হিসেবেই মনে করতো সে। কিন্তু নিজেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে পছন্দ করতো সে। আর সেই স্বপ্নটাকে ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে হতো তাঁর।
শাহনাজের মা ছিলেন একজন সফল মানুষ। সাংসারিক কাজের ফাঁকে তিনি বিভিন্ন রকম হাতের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন এবং সবার সাথে গল্প করতে করতে সুন্দর সুন্দর জিনিস তৈরি করে ফেলতে পারতেন। রান্নাতেও তাঁর ছিল ভীষণ দক্ষতা । একবার এক এক্সিবিশনে ডেজার্ট আইটেমের উপর প্রথম স্থান অর্জন করলেন তিনি। শাহনাজ তার মা’কে দেখে উদ্বুদ্ধ হন, কাজের প্রতি আগ্রহ জন্মে যায়। কিছু একটা করবার ইচ্ছেটা মনের মাঝে সারাক্ষণ শুধু ডানা ঝাপটাত।
শাহনাজ জানান, তাঁর বড় হয়ে ওঠার আগেই ওপারে পাড়ি জমান মা। ছোটবেলা মা’কে দেখে দেখে হাতের কাজের উপর আগ্রহ তৈরী হওয়ায় মা’য়ের স্মৃতিগুলো আঁকড়ে ধরে তাঁর প্রতিভা গুলোকে মাথায় রেখে বিভিন্ন রকম হাতের কাজ দিয়ে শুরু করেছিলেন তাঁর উদ্যোক্তা জীবন । বিভিন্ন রকম ব্লক-বাটিক ও কারচুপির কাজ দিয়ে শুরু করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমার ভিতর একটা জিনিষ ছিল যে, যখন যেই কাজটাই করতাম মন প্রাণ দিয়ে ভালবেসে করতাম।’
এভাবেই চলছিল। কিন্তু বৈশ্বিক মহামারি করোনায় থমকে গেল গোটা বিশ্ব। সারাবিশ্বে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ল। কোভিড-১৯ ভাইরাসের প্রকোপ বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের দেশেও ছড়িয়ে পড়ল। ঘরে বসে অলস সময় পার করছে সবাই। এই বিরুপ পরিস্থিতিও দমাতে পারেনি শাহনাজকে।
তিনি জানান, ‘করোনার এই পরিস্থিতিতে আমি চিন্তা করলাম এমন কি করা যায়, যেটাতে আমি মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারি, তখন আমার মনে হল, যে প্রোডাক্টগুলো নিত্যদিনে আমাদের প্রয়োজন হয়, সেই ধরনের কিছু পণ্য আমি যদি মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে পারি, তাহলে সবাই একটু উপকৃত হবে, স্বস্তি পাবে।
সেই থেকে শুরু হলো নিত্য প্রয়োজনীয় পন্যের সমাহার নিয়ে আমার নতুন পথচলা। কাজ করছি ঐতিহ্যপূর্ণ এবং মানসম্মত দেশীয় পণ্য নিয়ে। এতে যোগ হয়েছে খাঁটি সরিষার তেল, নারিকেল তেল, শ্রীমঙ্গলের বেস্ট কোয়ালিটি চা পাতা, কুমারখালীর বিখ্যাত গামছা ও বিভিন্ন ধরনের চাদর। সাধারনত আমরা জানি যে, গামছা দিয়ে শুধু মোছা-মুছির কাজ করা হয়। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় এখন এই গামছা দিয়ে বিভিন্ন ধরনের জিনিস তৈরি হচ্ছে। সম্প্রতি আমি এই গামছা দিয়ে এক ধরনের গয়না তৈরির কাজ শুরু করেছি। আলহামদুলিল্লাহ, সবাই অনেক পছন্দ করেছে। ভালো সাড়াও পাচ্ছি।
আর এতে সর্বাত্মক সহযোগিতা করছেন আমার হাজবেন্ড ব্যাংকার নাজমুল ইসলাম। তাঁর অনুপ্রেরণাতেই আমি আমার উদ্যোক্তা জীবনে সফলভাবে এগিয়ে চলার সাহস এবং শক্তি পেয়েছি।’
আপন মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে যাঁরা নানা প্রতিকুলতাকে জয় করে উদ্যোক্তার ভূমিকায় নিজকে দাঁড় করিয়েছেন, তাদের মধ্যে শাহনাজ পারভীন অন্যতম একজন। শাহনাজের ভাষায়, ছোটবেলায় যেখানেই যেতাম বাবাকে সাথে করে নিয়ে যেতাম। একা কোথাও যেতাম না। মা’কে হারানোর পর বাবাই ছিল একমাত্র ভরসার জায়গা। বাবা ছিল প্রচণ্ড মেধাবী,কর্মঠ এবং নিজের উপর প্রবল আত্মবিশ্বাসী।
পেশায় ডাক্তার বাবার উপদেশ ছিল ‘নিজের কাজগুলো নিজেই করার চেষ্টা করো, খুব প্রয়োজন ছাড়া কারো সাহায্য নেয়ার চেষ্টা করো না, কারো হেল্প নিয়ে কাজ করলে তুমি তার কাছে সারা জীবনের জন্য ঋণী হয়ে থাকবে, এই ঋণ কখনো শোধ করা যায় না।’ বাবার এই কথাগুলো আমার অন্তরে গেঁথে রয়েছে। বাবার মত আমারও নিজের উপর বিশ্বাসটা অটল। তাই আমিও চেষ্টা করি নিজের কাজগুলো নিজেই সামলে নিতে । আজ বাবা-মা কেউই আর বেঁচে নেই, কিন্তু বেঁচে আছে তাদের আদর্শ।