নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
মাধবদীতে পাইকারচর ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি মোবারক ও তার ভাই মোশারফের নেতৃত্বে স্থানীয় ব্যবসায়ী নুরু মিয়ার কারখানা ও বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে কারখানার ১৬ টি পাওয়ার লুম মেশিনের বিমের সুতা কেটে ফেলা, কারখানার কাপড় ও দোকানের ৪০মোটর ও বাড়িঘরের আসবাবপত্র ও আলমারি ভেঙ্গে নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার লুট সহ কোটি টাকা ক্ষতি সাধনের অভিযোগ উঠেছে।
রবিবার (২৩ এপ্রিল) দুপুরে মাধবদীর পাইকারচর ইউনিয়নের বিবিরকান্দি পূর্ব পাড়া এলাকার রাজ্জাক মুন্সির বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। এসময় তারা কুপিয়ে ও পিটিয়ে কারখানা মালিক মোঃ নুরু মিয়া (৬৫), তার ছেলে সোহেল (৩৫), মোঃ রানা (৩২), রুবেল (২৪), পাভেল (২২), ভাতিজা বাবু (২৪)কে গুরুতর আহত করে।
আহতরা বর্তমানে নরসিংদী সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
হামলায় নেতৃত্ব দানকারী পাইকারচর ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি মোবারক ও তার ভাই মোশারফ সাগরদী এলাকার ওমরের ছেলে ও পাইকারচর ইউপি চেয়ারম্যান আবুল হাশেম ও তার ছেলে সোহাগের ঘনিষ্ঠ সহচর। তারা চেয়ারম্যান আবুল হাশেম ও তার ছেলের মদদ পুষ্ট হয়ে এলাকায় ইতিপূর্বে ও বহু অপকর্ম করেছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী পরিবার।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ব্যবসায়ী নুরু মিয়ার পাওয়ার লুম কারখানার ১৬ টি মেশিনের বিমের সুতা ব্লেড দিয়ে কেটে কুঁচি কুঁচি করে ফেলা হয়েছে। ৩/৪ টি ঘরের আলমারি, খাট, চৌকি ও ড্রেসিং টেবিল সহ সমস্ত মালামাল ভেঙ্গে তছনছ করে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা।
এসময় তাদের কান্নায় বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। মাধবদী থানার এসআই বেলালের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল তখনো সেখানে অবস্থান করছিল।
এসময় এলাকাবাসী জানান, এলাকার প্রভাবশালী ব্যাক্তি আসাদ সাহেবের মালিকানাধীন ইমন গার্ডেনের বিভিন্ন অসামাজিক কার্যকলাপের কারণে প্রতি ঈদেই এখানে ঝগড়া বিবাদের সৃষ্টি হয়। এখানের খোলামেলা যৌনতার দৃশ্য এলাকার উঠতি বয়সের যুবক যুবতীদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আর এসকল অসামাজিক কার্যকলাপে এলাকাবাসী বাঁধা দিলে আগত দর্শনার্থীরা অন্য এলাকার লোকজন সমবেত করে পার্ক কর্তৃপক্ষের সহায়তায় এলাকাবাসীর উপর হামলা চালিয়ে তাদের মারধর ও বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ইমন গার্ডেনের নোংরা ও অসামাজিক কার্যকলাপই সকল ঝগড়ার মূল কারণ। তাই এলাকার যুব সমাজকে চারিত্রিক অবক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে ইমন গার্ডেন বন্ধ করার জন্য প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা করেন তারা।
কারখানা মালিক নুরু মিয়া বলেন, কোনকিছু বুঝে উঠার আগেই মোবারক ও তার ভাই মোশারফের নেতৃত্বে ৫০/৬০ জনের একটি দল আমাদের কারখানা ও বাড়িঘরে হামলা চালায়। এসময় আমি, আমার স্ত্রী ও আমার ছেলেরা বাঁধা দিলে তারা আমাকে, আমার স্ত্রী ও ছেলেদের বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করে এবং ঘর ও কারখানার সব ভেঙ্গে চুরমার করে সবকিছু লুটপাট করে নিয়ে যায়।
তার ছেলে সোহেল বলেন, পার্কের এখানে (ইমন গার্ডেন) কি নিয়ে যেন জগড়া হয় । সেখানের ঝগড়ার সূত্র ধরে মোবারকের নেতৃত্বে তারা প্রথমে আমাদের কারখানায় হামলা চালিয়ে ১৬ টি মেশিনের তানা কেটে কুঁচি কুঁচি করে দেয়। এসময় আমি ও আমার ভাইয়েরা বাঁধা দিলে তারা আমাদের কুপিয়ে জখম করে।
পরে আমাদের ঘরে এসে আমার বাবা মা কে মারধর করে আলমারি ও আসবাবপত্র ভাঙচুর করে ৩৮ টি কাপড়ের পিন্ডা, দোকানের ৪০ টি মটর, গহনা ও টাকা পয়সা লুটপাট করাসহ দেড় কোটি টাকার ক্ষতি করে। তারা দুপুর ২ টা থেকে শুরু করে বিকেল ৫ টা পর্যন্ত আমাদের বাড়িতে তান্ডব চালায় । পরে বিকেল ৫ টার পর পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তারা আমাদেরকে নিঃস্ব করে দিয়েছে। আমি আপনাদের মাধ্যমে আমাদের উপর হামলা, ভাংচুর ও লুটপাটের সঠিক বিচার চাই।
এসময় তার ছোটভাই রুবেল কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, তারা আমার সব শেষ করে দিয়েছে। আমার উপার্জনের একমাত্র পথ কারখানার তানা গুলো কেটে টুকরো টুকরো করে দিয়েছে। আমার ও আমার বাড়ির মেহমানদের ১৫ ভরি স্বর্ণালঙ্কার ও টাকা লুট করে নিয়ে গেছে। তারা আমাকে মেরে ফেললে এর চেয়ে অনেক বেশি ভালো ছিল। আমি প্রধান মন্ত্রী ও প্রশাসনের কাছে এর সঠিক বিচার চাই।
এ ব্যাপারে অভিযুক্ত পাইকারচর ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি মোবারকের কাছে জানতে চাইলে তিনি ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, আমি মাধবদীতে এহরামের কাপড় কিনতে ছিলাম। পরে খবর পেলাম পার্কের সামনে মোতা ও তার ভাইয়ের সাথে ঝগড়া হয়েছে। খবর পেয়ে আমার ছোটভাই মোশারফ ও তার ছেলে সেখানে গেলে তারা তাদের মারধর করে। আমি বাড়িতে এসে দেখি আমাদের এলাকার প্রায় দুই থেকে আড়াই শত লোক জড়ো হয়ে আছে। আমি তাদের নিয়ে আসাদ সাবের পার্কের সামনে গিয়ে দেখি নুরু মিয়ার ছেলেরা সাইফুল নামে একটি ছেলেকে মারধর করছে। আসাদ সাবের ভাগিনা এতে বাঁধা দিলে তারা তাকে ও মারধর করে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে আসাদ সাবের লোকজন নুরু মিয়ার ছেলেদের মারধর করে এবং তাদের কারখানা ও বাড়িতে হামলা চালায়।
পাইকারচর ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ও ৩ নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, প্রথমে পার্কের সামনে ঝগড়া হলে আসাদ সাব তা মিটমাট করে দেয়। বিগত দুই মাস আগে নুরু মিয়ার ছেলে রানা ও তার ভাই খাদিমারচর যাওয়ার পথে সাইফুলের সাথে ঝগড়া হয়। তখন সাইফুল তার দলবল নিয়ে রানা ও তার ভাইকে অনেক মারধর করে। আজ পার্কের ঝগড়া শেষে সাইফুল ও তার লোকজন নুরু মিয়ার বাড়ির পাশ দিয়ে যাবার সময় রানা তাদের দেখে ফেলে। এই সুযোগে বিগত দিনের মারধরের প্রতিশোধ নিতে তারা সাইফুল ও তার লোকজনকে বেদম মারধর করে।এতে আসাদ সাবের ভাগিনা বাঁধা দিলে তারা তাকে ও মারধর করে। এসময় সাগরদী ও বিবিরকান্দি এলাকার বহু লোকজন সমবেত হয়। তবে কোন পক্ষের লোকজন মিলে নুরু মিয়ার বাড়িতে হামলা চালিয়েছে তা তিনি বলতে পারবেন না বলে ও জানান তিনি।
নুরু মিয়ার ছেলে রানার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, আমরা পরিবারের সবাই নরসিংদী সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছি। মাধবদী থানা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সবকিছু দেখে এসেছে। তাদের চিকিৎসা শেষে থানায় অভিযোগ দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
এবিষয়ে জানতে ইমন গার্ডেনের মালিক আসাদ সাহেবের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি রকিবুজ্জামান ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, মাধবদী থানা পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে এব্যাপারে আমরা এখনো পর্যন্ত কোন লিখিত অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে ও জানান তিনি।