আব্দুল্লাহ আল মামুন (প্রধান প্রতিবেদক): কেরানীগঞ্জে পোশাক ব্যবসায়ী ও পুলিশের সোর্স সাইফুল ইসলাম হত্যাকান্ডের ২৪ ঘন্টার মধ্যে হত্যাকান্ডে সরাসরি জড়িত ৭ জনকে শাহবাগ থানা এলাকা হতে আটক করেছে র্যাব।
চাঞ্চল্যকর সাইফুল হত্যাকান্ডে আটককৃতদের মধ্যে মূল পরিকল্পনাকারী মো. রাজন হোসেন (৩১), পিতা- আফসার উদ্দিন এবং হত্যাকা-ে অন্যান্য সহযোগীরা হচ্ছে মো. জানে আলম (৩৬), পিতা- আফসার উদ্দিন, মো. সুমন ওরফে গর্দা সুমন (২৫), পিতা- মৃত: সেন্টু মিয়া, মো. লিটন হোসেন (২৬), পিতা- মো. আবুল কাশেম, মো. দিপু (২৩), পিতা- মৃত: শামছুল হক, মো. সরোয়ার আকন্দ (২৬), পিতা- মো. ছালাম আকন্দ ও মো. সজীব (২৯), পিতা- মো. আলী হোসেন। সর্ব সাং- দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।
তাদের দখল হতে হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত সূচালো লোহার রড, ১ টি ভাঙ্গা ক্রিকেট ব্যাট, ১ টি ব্যাটন ও ৬ টি মোবাইলসেট উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা সাইফুল হত্যাকা-ের সাথে তাদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তথ্য প্রদান করেছে বলে বার্তা বিচিত্রাকে নিশ্চিত করেছেন র্যাবের লিগ্যাল এন্ড মিডিয়া উইং এর সহকারী পরিচালক খন্দকার আল মঈন।
সূত্রমতে, ভিকটিম সাইফুল ইসলাম দীর্ঘদিন যাবত ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের খেজুরবাগ সাতপাখি এলাকায় পরিবারের সাথে বসবাস করে আসছিল এবং সাতপাখি রোডে একটি দোকান ভাড়া নিয়ে কাপড়ের ব্যবসা করতো। সে ছিল এলাকায় সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠ। মাদক ও সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ গঠনে সে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতো। বিভিন্ন সময় সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসা সম্পর্কে তথ্য দিয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকেও সহায়তা করতো সে। এ কারনে স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ী ও অন্যান্য অপরাধীরা ভিকটিম সাইফুল এর প্রতি ক্ষিপ্ত ছিল।
গ্রেফতারকৃত আসামিরা সকলেই দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ এলাকায় বসবাস করতো। এরা বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকান্ডের জন্য বিভিন্ন সময়ে আইন-শৃংখলাবাহিনীর হাতে আটক হলে ভিকটিম সাইফুলকে এর জন্য দায়ী মনে করতো। তাই অন্য অপরাধে আটক রাজন গত ১৯ জুলাই তারিখে জামিনে মুক্তি পেয়ে জানে আলম, সুমন ও অন্যান্য সহযোগীদের নিয়ে ভিকটিম সাইফুলকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার পরিকল্পনা করতে থাকে। এছাড়া তারা বিভিন্ন সূত্রে জানতে পারে যে, ভিকটিম সাইফুল চাকুরীর উদ্দেশ্যে শিঘ্রই বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিল। এজন্য তাড়াহুড়া করে গ্রেফতারকৃত রাজনের নেতৃত্বে জানে আলম, সুমন, লিটন, দিপু, সরোয়ার ও সজীবসহ ১০/১২ জনের একটি দল গত ৩০ জুলাই রবিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭ টার দিকে ভিকটিম সাইফুলকে উচিত শিক্ষা দেয়ার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে। সে অনুযায়ী সাইফুল দোকান থেকে বাসায় ফেরার পথে গ্রেফতারকৃতরা খেজুরবাগ স্কুল রোডে ওঁৎ পেতে থাকে। সাইফুল দোকান বন্ধ করে রাত আনুমানিক সাড়ে ১১ টার দিকে খেজুরবাগ স্কুল রোডে এসে পৌঁছলে রাজন ও তার দল ভিকটিমের পথরোধ করে ভিকটিমকে ক্রিকেট ব্যাট, ব্যাটন, লোহার রড় ও অন্যান্য দেশীয় অস্ত্র দিয়ে নৃশংসভাবে মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাথাড়ি আঘাত করতে থাকে। একপর্যায়ে ভিকটিম মাটিতে লুটিয়ে পড়ে গেলে রাজন পাশের একটি দোকান থেকে চামচ নিয়ে এসে ভিকটিমের চোখ নৃশংসভাবে উপড়ে ফেলে। ভিকটিমের চিৎকারে স্থানীয়রা এগিয়ে আসলে গুরুতর আহত অবস্থায় ভিকটিমকে ফেলে তারা দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
পরবর্তীতে স্থানীয়রা ভিকটিমকে উদ্ধার করে রাজধানীর একটি সরকারি হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। হত্যাকান্ড সংঘটনের পর এলাকা থেকে পালিয়ে তারা কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপন করে। কিন্তু হত্যাকান্ডের ঘটনাটি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে তারা আত্মগোপনের উদ্দেশ্যে রাজধানীর বাহিরে গমনকালে র্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র্যাব-১০ এর একটি আভিযানিক দল রাজধানীর শাহবাগ থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের ধরে ফেলে। গ্রেফতারকৃতরা এলাকায় মাদক ব্যবসা ও অর্থের বিনিময়ে সন্ত্রাসীসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকা- সম্পাদন করত বলে জানা যায়।
এদের মধ্যে রাজন স্থানীয় একটি রিক্সা গ্যারেজ পরিচালনা করত। পাশাপাশি এলাকায় মাদক, ছিনতাই, ডাকাতি, গাড়ি চুরিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডের সাথে জড়িত ছিল। উক্ত হত্যাকান্ডটি তার নেতৃত্বে সংঘটিত হয় এবং হত্যাকা-ের সময় সে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে ভিকটিম সাইফুলকে উপর্যুপরি আঘাত করে এবং চামচ দিয়ে নৃশংসভাবে ভিকটিম সাইফুলের চোখ উপড়ে ফেলে। তার বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদক, বিস্ফোরক দ্রব্য ও চুরিসহ ৫ টির অধিক মামলা রয়েছে বলে জানা যায়।
জানে আলম রাজমিস্ত্রির কাজের সাথে জড়িত। পাশাপাশি সে এলাকায় মাদক, ছিনতাই, চুরিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডের সাথেও জড়িত রয়েছে। তার বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদক, বিস্ফোরক দ্রব্য ও চুরিসহ ৪ টির অধিক মামলা রয়েছে বলে জানা যায়।
সুমন কাঠ কাটা শ্রমিক এর কাজ করতো। পাশাপাশি এলাকায় মাদক, ছিনতাই, চুরিসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের সাথে জড়িত রয়েছে। তার বিরুদ্ধে অস্ত্র, মাদক, ডাকাতি ও মারামারিসহ বিভিন্ন অপরাধে ৪ টির অধিক মামলা রয়েছে বলে জানা যায়।
সাইফুল হত্যাকান্ডে অন্যান্য সহযোগীদের মধ্যে লিটন পেশায় মুদ্রাক্ষরিক, দিপু ও সজীব জাহাজ ভাঙ্গার শ্রমিক এবং সরোয়ার রং মিস্ত্রির কাজ করতো। তারা রাজনের নেতৃত্বে এলাকায় মাদক, ছিনতাই, চুরিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকা- সংঘটিত করতো। তাদের বিরুদ্ধে মাদক ও ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধে একাধিক মামলা রয়েছে বলে জানা যায়।
সাইফুল হত্যাকান্ডের ঘটনায় ভিকটিমের বড় বোন বাদী হয়ে কেরানীগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। যার মামলা নং- ০১, তারিখ- ০১ আগস্ট ২০২৩ খ্রিঃ এবং ধারা- ৩০২/৩৪/৮৯ দন্ডবিধি।