ছাতারপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক লাঞ্চনার ঘটনায় বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ

Date: 2023-09-12
news-banner



আব্দুল্লাহ আল মামুন (প্রধান প্রতিবেদক):  

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর থানাধীন আড়িয়া ইউনিয়নের ছাতারপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক লাঞ্চনার ঘটনায় এবার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। যশোর, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক মো. সিরাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত বিঅ-৬/৫৩৩১/৪২১ নং স্মারকমূলে গত ৫ সেপ্টেম্বর উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরেজমিনে তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন প্রেরণ করার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হয়। 

এর আগে গত ১৮ জুলাই ছাতারপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভপতি তহমিদুর রহমানের প্রত্যক্ষ নির্দেশে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে শিক্ষক-কর্মচারীদের সামনে কমিটির সদস্য আলিহিম মন্ডল ও তার ছেলে বিদ্যালয়ের সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী আশিকুর রহমান হত্যা চেষ্টার উদ্দেশ্যে সিনিয়র সহকারী শিক্ষক সহিদুল হকের উপর হামলা করে। এ সময় আশিকুর রহমান শিক্ষক সহিদুল হকের মাথায় প্রচন্ড আঘাত করলে মাথা ফেটে রক্তাক্ত জখম হয় এবং তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। ঘটনার বিবরণ উল্লেখ করে যশোর, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর গত ৬ আগষ্ট খ্রিঃ তারিখে সরকারি বিধি মোতাবেক নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও নিরাপত্তাকর্মীর ব্যাপারে প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য তিনি লিখিত আবেদন জানান। ১৮ জুলাই ঘটনার পরপর ভিকটিমের ছেলে তানভীর মাহমুদ বাদী হয়ে দোষীদের বিরুদ্ধে দৌলতপুর থানায় মামলা দায়ের করলে পুলিশ সেদিনই সভাপতি তহমিদুর রহমানকে আটক করে বিজ্ঞ আদালতের মাধমে জেল হাজতে প্রেরণ করে। পরবর্তীতে জেল হাজত হতে বের হয়ে এসে তহমিদুর রহমান মামলা তুলে নেওয়ার জন্য তাকে (শিক্ষক সহিদুল হক) এবং তার পরিবারকে হুমকি প্রদান করছে বলেও তিনি তার আবেদনে উল্লেখ করেন। 

সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দৌলতপুর থানায় গত ১৮/০৭/২০২৩ খ্রিঃ তারিখ, মামলা নং- ২২, দন্ডবিধি: ১৪৩/৩২৩/৩২৫/৩০৭/৫০৬(২) ধারায় রুজু হলেও থানা পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার মামলাটি তদন্তকালে সাক্ষ্য প্রমান, ডাক্তারী সনদপত্র পর্যালোচনাসহ ঘটনার পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে অভিযুক্ত মো. তহমিদুর রহমান (৬৩), মো. আলিহিম মন্ডল (৪২) ও মো. আশিকুর রহমান পেনাল কোডের ৩২৩/৩০৭/৫০৬(২) ধারায় অপরাধ করেছে বলে প্রাথমিকভাবে সত্য প্রমানিত হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে গত ৩১/০৭/২০২৩ খ্রিঃ তারিখ দৌলতপুর থানার অভিযোগপত্র নং- ৪৬৯ বিজ্ঞ আদালতে বিচারের জন্য দাখিল করা হয় বলে মামলাসূত্রে জানা যায়। 

সূত্রে আরো জানা যায় যে, এই মামলায় ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬১ নং ধারা মোতাবেক সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দী দিয়েছেন ছাতারপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. রিয়াজুল ইসলাম, সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. নূরে আলম ফরহাদ, সহকারী শিক্ষক মো. আরমান আলী এবং অফিস সহকারী মো. শিবলী আল ফারুকী। তাদের প্রত্যেকের জবানবন্দীর বক্তব্যে একজন শিক্ষক সহিদুল হক, যিনি দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে সুনামের সাথে বিদ্যালয়ে পাঠদান করছেন, তাঁর সেই চিরচেনা বিদ্যালয় কক্ষে তাঁর সহকর্মী শিক্ষকবৃন্দ ও অফিসকর্মীদের সামনে তাকে প্রথমে মানসিক ও পরে শারীরিকভাবে লাঞ্চনার নির্মম এক চিত্র ফুটে উঠেছে। দুষ্কৃতকারীরা “শিক্ষক লাঞ্চনার এক নির্মম ছবি” এঁকেই নিবৃত্ত হয়নি, বরং সেখান থেকে দাপট দেখিয়ে বের হয়ে যাবার বেলায় তারা মারাত্মকভাবে আহত হয়ে মাটিয়ে লুটিয়ে পড়ে থাকা সেই শিক্ষককে ভবিষ্যতে জখম ও খুনের হুমকিও দিয়ে যায়। আর এ ঘটনা যারা ঘটিয়েছে তাদের নাম-ঠিকানা ও PC&PR যাচাই সাপেক্ষে CDMS সার্চ করে তাদের বিরুদ্ধে দৌলতপুর থানার মামলা নং- ৯, তারিখ: ০৩/০২/২০২০ খ্রিঃ, ধারা: ১৪৩/৩২৩/৩৭৯/৪২৭/৫০৬/১১৪ পেনাল কোড পাওয়া যায়। যাহা বিজ্ঞ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। অর্থাৎ পূর্ব হতেই তারা এ ধরনের ঘটনার নায়ক হয়ে আছে বলে জানা যায়। 

বার্তা বিচিত্রার এক অনুসন্ধানে জানা যায় যে, বিগত ঐ সময়ে বিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগীতা চলাকালীন শিক্ষার্থী, অভিভাবকবৃন্দ, দর্শনার্থী ও এলাকাবাসীসহ বিশাল জনসমাবেশের মধ্যে এই বিদ্যালয়েরই একজন শিক্ষককে অন্যায়ের প্রতিবাদ করার কারনে শারীরিকভাবে নির্মম নির্যাতন করেছিল শিক্ষক লাঞ্চিত ও নির্যাতন কর্মে সিদ্ধহস্ত উল্লেখিত মামলার চিহ্নিত এই তিন আসামী আশিকুর রহমান, আশিকুর রহমানের পিতা আলিহিম মন্ডল ও চাচা তহমিদুর রহমান। এ প্রসঙ্গে আরো জানা যায় যে, সম্প্রতি বিদ্যালয়ে কয়েকটি শূন্যপদে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিয়োগদানকে কেন্দ্র করে ম্যানেজিং কমিটি ও প্রধান শিক্ষককে সমর্থন করতে না পারায় শিক্ষক সহিদুল হকের উপর তারা ক্ষুব্ধ ছিলেন। বিষয়টি মামলর এজাহারে উল্লেখ না থাকা প্রসঙ্গে মামলার বাদী ভিকটিমের ছেলে তানভীর মাহমুদ বার্তা বিচিত্রাকে জানান, “মামলা-মোকদ্দমায় আমাদের খুব একটা পারদর্শীতা নাই। তাই অল্প সময়ে তাড়াহুড়ো করে এজাহারে সব কথা গুছিয়ে লেখা হয় নাই। তাছাড়া মামলার এজাহার লেখার সময় বাবার দুইজন সহকর্মীর সাথে প্রধান শিক্ষক মো. রিয়াজুল ইসলামও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।” 

অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিয়োগদান বিষয়ে জানার অগ্রহ নিয়ে কথা বলতে চেয়ে অফিস সহায়ক হিসেবে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত মো. আলমগীরকে মুঠোফোনে কল দিলে ওপাশ থেকে কলটি রিসিভ করেন তিনি। কিন্তু কথা বলার সময় তিনি পরিচয় জানতে চাইলে, পেশাগত পরিচয় দেবার সাথে সাথে কোনো কথা না বলে কলটি কেটে দেন অফিস সহায়ক আলমগীর। পরে বেশ কয়েকবার কল করেও আর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি তার। এমতাবস্থায় বিভাগীয় সঠিক ও সুষ্ঠ তদন্তের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সকল সত্য বেরিয়ে আসবে বলে মনে করেন ভুক্তভোগী পরিবার ও এলাকার সর্বসাধারন।

Leave Your Comments