টানা ১৭ বছর নির্বাচনহীন সমিতি, প্রতিদিন লাখো টাকা আদায়ের অভিযোগ; বিদেশে অর্থ পাচারেরও ইঙ্গিত
মোঃ আতিকুর রহমান, ক্রাইম রিপোর্টার-
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি এবং সম্পদে ভরপুর সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলা। টাঙ্গুয়ার হাওর, যাদুকাটা নদী, একাধিক শুল্ক স্টেশন ও বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই প্রভাবশালী মহলের নজরে। আর এই সুযোগকে কেন্দ্র করেই গতো ১৭ বছর এখানে গড়ে উঠেছিলো একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট—যার অন্যতম আলোচিত নাম রাজেশ তালুকদার।
অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সুনামগঞ্জ-১ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের ঘনিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে রাজেশ তালুকদার তাহিরপুরে নিজের প্রভাব বিস্তার করেন। যদিও তিনি এই উপজেলার ভোটার নন, তবুও তৎকালীন বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত দুর্নীতিবাজ সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের ছত্রছায়ায় অল্প সময়েই হয়ে ওঠেন প্রভাবশালী এক ব্যক্তি। স্থানীয়দের ভাষ্য, “রাতারাতি কোটিপতি” হয়ে ওঠেন তিনি।
জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার লালারগাঁও গ্রামের বাসিন্দা রাশেন্দ্র তালুকদারের ছেলে রাজেশ তালুকদার তাহিরপুর কয়লা আমদানিকারক সমিতির সচিব হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই শুরু হয় অনিয়ম ও চাঁদাবাজির। সমিতির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি দুই বছর পরপর নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও, অভিযোগ অনুযায়ী ২০০৯ সাল থেকে টানা ১৭ বছর কোনো নির্বাচন ছাড়াই এমপির দাপটে ভুল আইনি নাটক সাজিয়ে একই কমিটি বহাল রাখা হয়।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সমিতির নাম ভাঙিয়ে প্রতি ৫০ টন কয়লা ও চুনাপাথরের বিপরীতে ৩ হাজার টাকা করে চাঁদা আদায় করা হতো। এসব চাঁদার রশিদে কোনোটাতেই বহি নম্বর থাকতো না। এছাড়া নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তির সময় সরকারি নির্ধারিত ফি’র বাইরে ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পাটলাই নদীপথে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ স্টিলবডি বাল্কহেড নৌকা কয়লা ও চুনাপাথর পরিবহন করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। এসব নৌকা থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে সিন্ডিকেটটির বিরুদ্ধে। দীর্ঘ এই সময়ে আদায়কৃত টাকার পরিমাণ শত কোটি টাকার বেশি হতে পারে বলে ধারণা স্থানীয়দের।
অভিযোগ রয়েছে, এই বিপুল অর্থের একটি অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
চাঁদাবাজির অর্থে রাজেশ তালুকদার বিশ্বম্ভরপুরে একটি বড় রাইস মিল, সুনামগঞ্জ শহরে বাড়িসহ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে দাবি এলাকাবাসীর।
এ বিষয়ে অতীতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের।
রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে রাজেশ তালুকদার বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পদও লাভ করেন ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকারের পট পরিবর্তনের পরও তিনি সমিতির সচিব পদে বহাল থাকায় জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—কিসের ভিত্তিতে এখনো দায়িত্বে রয়েছেন তিনি?
এ বিষয়ে তাহিরপুর কয়লা আমদানিকারক সমিতির সভাপতি খসরুল আলম বলেন, “তার বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীদের অনেক অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘ ১৭ বছরের হিসাব বুঝে নেওয়ার জন্য আপাতত তাকে রাখা হয়েছে। হিসাব গ্রহণ শেষ হলে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
এদিকে পুরো বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ী মহল, সচেতন নাগরিক ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র উন্মোচন এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।
এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য ও অনুসন্ধান নিয়ে শিঘ্রই প্রকাশিত হবে বার্তা বিচিত্রার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন “ফাঁদ”। দেখতে চোখ রাখুন বার্তা বিচিত্রার অফিসিয়াল পেইজে।