মোঃ আতিকুর রহমান, ক্রাইম রিপোর্টার:
হাওরাঞ্চলের বোরো ফসল রক্ষায় নির্মিত ফসল রক্ষা বাঁধ প্রকল্পে আবারও ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)-এর একাংশ কর্মকর্তা, স্থানীয় প্রভাবশালী মহল ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) কিছু সদস্যের যোগসাজশে ‘ভাগ-বাটোয়ারা বাণিজ্য’ চালিয়ে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যকে ভণ্ডুল করা হচ্ছে। এতে হাওরের হাজারো কৃষকের একমাত্র অবলম্বন বোরো ফসল পড়েছে মারাত্মক ঝুঁকিতে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, চলতি মৌসুমে সুনামগঞ্জ জেলার ১২টি উপজেলায় প্রায় ৬০২ কিলোমিটার ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের জন্য ১৪৬ থেকে ১৪৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বাস্তবায়নের জন্য ৭০০টিরও বেশি পিআইসি গঠন করা হলেও নির্ধারিত সময়সীমা অনুযায়ী অধিকাংশ কাজ শেষ হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী ১৫ ডিসেম্বর কাজ শুরু হয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও মার্চের শেষ সপ্তাহেও বহু বাঁধ অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।
দিরাই, শাল্লা, তাহিরপুর, জগন্নাথপুর, জামালগঞ্জ ও শান্তিগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, কোথাও কাজ শুরুতেই বিলম্ব, কোথাও মাঝপথে বন্ধ। শনি ও মাটিয়ান হাওরসহ বিস্তীর্ণ এলাকার বোরো ফসল এখন ঝুঁকির মুখে। আম্মকখালী ও আলমখালী বাঁধের কাজ শেষ না হওয়ায় পাহাড়ি ঢল নামলে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের শুরু থেকেই একটি শক্তিশালী ‘কমিশন সিন্ডিকেট’ সক্রিয় থাকে। অর্থ ছাড়ের আগেই ভাগ-বাটোয়ারা নির্ধারণ হয়ে যাওয়ায় মাঠপর্যায়ে কাজের মান মারাত্মকভাবে কমে যায়। অনেক ক্ষেত্রে বাঁধের নিচ থেকেই মাটি তুলে আবার তা দিয়ে কাজ দেখানো হচ্ছে, কোথাও পুরনো বাঁধে সামান্য মাটি ফেলে সম্পন্ন দেখানো হচ্ছে। এতে বাঁধের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পিআইসি গঠনে প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালীদের অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগও উঠেছে। এতে প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ব্যাহত হচ্ছে। কাজের মান যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে নিম্নমানের কাজ অনুমোদনের অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, অধিকাংশ বাঁধে নির্ধারিত উচ্চতা ও প্রস্থ মানা হয়নি। অনেক স্থানে বালু ও কাদা মিশ্রিত মাটি ব্যবহার করা হয়েছে, যা সামান্য পানির চাপেই ধসে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে। ইতোমধ্যে মার্চের শুরুতে উজানের ঢল ও বৃষ্টির পানিতে কয়েকটি বাঁধ আংশিক ভেঙে গিয়ে কিছু হাওরে পানি ঢুকে পড়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “প্রতিবছরই একই চিত্র দেখি। কাগজে বড় কাজ দেখানো হয়, বাস্তবে কাজ হয় না। আগে থেকেই টাকার ভাগ হয়ে যায়। পানি এলেই বাঁধ ভেঙে আমাদের ফসল নষ্ট হয়।” তারা অভিযোগ করেন, বারবার জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
বিভিন্ন এলাকায় অনিয়মের প্রতিবাদে মানববন্ধনও হয়েছে। হাওর আন্দোলনের নেতারা পাউবো’র কর্মকর্তা এসও মনির হোসেনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ তুলেছেন। সম্প্রতি সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল এলাকা পরিদর্শনে গেলে কৃষকরা সরাসরি তার কাছে অভিযোগ জানান। তিনি দ্রুত কাজ শেষ করার নির্দেশ দেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
তবে এসও মনির হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, “সব কাজ নিয়ম মেনেই করা হচ্ছে, অভিযোগ ভিত্তিহীন।”
এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাওরাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতি সম্পূর্ণভাবে ফসল রক্ষা বাঁধের ওপর নির্ভরশীল। তাই এ প্রকল্পে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও স্থানীয় কৃষকদের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় প্রতিবছরই হাজার হাজার কৃষক ক্ষতির মুখে পড়বেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত এবং টেকসই ও মানসম্মত বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী কৃষক ও সচেতন মহল।