ভূমধ্যসাগরে মৃত্যুর মিছিল: সুনামগঞ্জে ৯ দালালের বিরুদ্ধে মামলা

Date: 2026-03-31
news-banner

মোঃ আতিকুর রহমান, ক্রাইম রিপোর্টার:
 
লিবিয়া থেকে অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ পথে ভূমধ্যসাগরে ১২ বাংলাদেশি তরুণের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় সুনামগঞ্জে মানব পাচার অপরাধ দমন আইনে ৯ দালালের বিরুদ্ধে দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। সোমবার রাতে জেলার জগন্নাথপুর ও দিরাই থানায় পৃথক এই মামলা দুটি করা হয়।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, জগন্নাথপুর থানায় দায়ের করা মামলায় পাঁচজন এবং দিরাই থানায় দায়ের করা মামলায় চারজনকে আসামি করা হয়েছে। দিরাই থানার মামলার বাদী হয়েছেন নিহত সোহানুর রহমানের বাবা ছালিকুর রহমান। সোহানুর রহমান দিরাই উপজেলার জগদল ইউনিয়নের বাসুরি গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। অপরদিকে, জগন্নাথপুর থানার মামলার বাদী হয়েছেন পাইলগাঁও ইউনিয়নের বাসিন্দা হাবিবুর রহমান, যার ছেলে আমিনুর রহমান একই ঘটনায় প্রাণ হারান।

সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজন সরকার জানিয়েছেন, তদন্তের স্বার্থে আপাতত আসামিদের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না। তবে জড়িতদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং শিগগিরই তাদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

ঘটনার বিবরণে জানা যায়, গত ২১ মার্চ লিবিয়া থেকে ৪৮ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে নিয়ে একটি ছোট রাবারের নৌকা গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করে। যাত্রাপথে নৌযানটির জ্বালানি ফুরিয়ে গেলে সেটি দিক হারিয়ে ফেলে এবং টানা ছয় দিন সাগরে ভাসতে থাকে। এ সময় তীব্র খাদ্য ও পানির সংকটে একে একে  ২২ জন যাত্রী মৃত্যুবরণ করেন। নিহতদের মধ্যে সুনামগঞ্জ জেলার ১২ জন তরুণ রয়েছেন।

বেঁচে ফেরা একাধিক যাত্রী ও নিহতদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মৃত্যুর পর দুই দিন পর্যন্ত মরদেহগুলো নৌকাতেই রাখা হয়েছিল। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সঙ্গীরা বাধ্য হয়ে লাশগুলো সাগরে ভাসিয়ে দেন।
পরবর্তীতে ২৭ মার্চ গ্রিস উপকূলে ভাসমান অবস্থায় থাকা নৌকা থেকে ২৬ জনকে জীবিত উদ্ধার করে দেশটির কোস্টগার্ড। পরদিন নিহতদের স্বজনদের কাছে এই মর্মান্তিক ঘটনার খবর পৌঁছালে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।

নিহতদের মধ্যে দিরাই উপজেলার ৬ জন, জগন্নাথপুর উপজেলার ৫ জন এবং দোয়ারাবাজার উপজেলার ১ জন রয়েছেন। নিহতরা হলেন, দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারাপাশা গ্রামের আবু সরদারের ছেলে মো. নুরুজ্জামান সরদার ময়না (৩০), আবদুল গণির ছেলে সাজিদুর রহমান (২৮), ইসলাম উদ্দিনের ছেলে সাহান এহিয়া (২৫) ও একই উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের আবদুল মালেকের ছেলে মুজিবুর রহমান (৩৮), করিমপুর ইউনিয়নের মাটিয়াপুর গ্রামের তায়েক মিয়া ও বাসুরি গ্রামের সোহাস। 

দোয়ারাবাজার উপজেলার কবিরনগর গ্রামের ফয়েজ উদ্দিনের ছেলে আবু ফাহিম।  জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া গ্রামের সোহানুর রহমান, টিয়ারগাঁও গ্রামের শায়েক আহমেদ, চিলাউড়া কবিরপুর গ্রামের মো. নাঈম, পাইলগাঁও গ্রামের আমিনুর রহমান, ইছগাঁও গ্রামের মোহাম্মদ আলী। প্রত্যেকেই ছিলেন যুবক এবং পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ।

তদন্তে আরো জানা গেছে, ইউরোপে যাওয়ার আশায় এসব তরুণ দালালদের ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত দিয়েছেন। অনেকেই গরু, জমিজমা বিক্রি করে এই অর্থ জোগাড় করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সুনামগঞ্জ জেলায় দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ দালাল চক্র সক্রিয় রয়েছে, যাদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ লিবিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত।

সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া জানিয়েছেন, জগন্নাথপুর ও দিরাই উপজেলায় ইউএনওরা ইতোমধ্যে দালালদের একটি তালিকা প্রস্তুত করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছেন। 
পাশাপাশি জেলার অন্যান্য উপজেলাতেও এ ধরনের চক্রের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলছে। তিনি বলেন, “ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে প্রশাসন রয়েছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

এই হৃদয়বিদারক ঘটনা আবারও প্রমাণ করল, অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার ঝুঁকি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। জীবন বাঁচাতে ও মানব পাচার রোধে এখনই সচেতনতা বাড়ানো এবং কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Leave Your Comments