২০২৬ সালের শুরু থেকেই দেশের স্বর্ণবাজারে যেন এক অস্থিরতার ঝড় বইছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং স্থানীয় বাজারে চাহিদা বৃদ্ধির প্রভাবে মাত্র তিন মাসেই স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছে রেকর্ড ৫১ বার। এতে করে কখনও দাম হু হু করে বেড়েছে, আবার কখনও বড় পতনে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন ক্রেতারা।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)-এর তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ—এই তিন মাসে স্বর্ণের দাম মোট বেড়েছে ২৩ হাজার ৭৯৫ টাকা। এ সময়ের মধ্যে ৩০ দফা দাম বাড়ানো হয়েছে এবং ২১ দফা কমানো হয়েছে। যেখানে গত বছরের একই সময়ে মাত্র ১৭ বার দাম সমন্বয় করা হয়েছিল।
সর্বশেষ দাম
সবশেষ বুধবার (১ এপ্রিল) সকালে বাজুস নতুন করে স্বর্ণের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। এ দফায় প্রতি ভরিতে ৩ হাজার ২৬৬ টাকা বাড়ানো হয়। নতুন দরে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণ বিক্রি হচ্ছে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৯৭৭ টাকায়। এছাড়া—
-
২১ ক্যারেট: ২ লাখ ৩৬ হাজার ৭২১ টাকা
-
১৮ ক্যারেট: ২ লাখ ২ হাজার ৮৯৫ টাকা
-
সনাতন পদ্ধতি: ১ লাখ ৬৫ হাজার ২৭৯ টাকা
এর আগে ৩১ মার্চও একই পরিমাণে দাম বাড়িয়ে ২২ ক্যারেটের স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ২ লাখ ৪৪ হাজার ৭১১ টাকা।
জানুয়ারিতে চরম ওঠানামা
বছরের শুরুতেই স্বর্ণবাজারে অস্বাভাবিক ওঠানামা দেখা যায়। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই টানা কয়েক দফা দাম বাড়ানো হয়। ১০, ১২, ১৪, ১৯, ২০ ও ২১ জানুয়ারি টানা ৬ দফা বৃদ্ধির ফলে দাম পৌঁছে যায় ২ লাখ ৫২ হাজার ৪৬৭ টাকায়।
এরপর ২৩ জানুয়ারি এক লাফে ৬ হাজার ২৯৯ টাকা বেড়ে দাম দাঁড়ায় ২ লাখ ৫৫ হাজার ৬১৭ টাকা, যা তখনকার সর্বোচ্চ ছিল। কিন্তু সবচেয়ে বড় চমক আসে ২৯ জানুয়ারি—একদিনেই রেকর্ড ১৬ হাজার ২১৩ টাকা বেড়ে দাম দাঁড়ায় ২ লাখ ৮৬ হাজার ১ টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
তবে এর পরপরই ঘটে বড় পতন। ৩০ ও ৩১ জানুয়ারি টানা দুই দিনে মোট ৩০ হাজার ৩৮৪ টাকা কমে দাম নেমে আসে ২ লাখ ৫৫ হাজার ৬১৭ টাকায়।
ফেব্রুয়ারিতেও অস্থিরতা অব্যাহত
ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে স্বর্ণের দাম ১৫ বার সমন্বয় করা হয়। এর মধ্যে ৮ বার দাম বাড়ে এবং ৭ বার কমে। মাসের শুরুতে দাম কমলেও ৩ ফেব্রুয়ারি একদিনেই দুই দফায় ১৬ হাজার ৩৩০ টাকা বাড়ে। পরে আবার কমে-বাড়ে—এভাবে পুরো মাসজুড়েই বাজার ছিল অস্থির।
মাসের শেষ দিকে ২৮ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত দরে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম দাঁড়ায় ২ লাখ ৬৮ হাজার ৬৮০ টাকা।
মার্চে বড় পতন, পরে পুনরুদ্ধার
মার্চ মাসে মোট ১৭ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়। মাসের শুরুতে দাম বাড়লেও মাঝামাঝি সময়ে বড় পতন দেখা যায়। ১২ থেকে ২৭ মার্চ পর্যন্ত টানা ৮ দফায় মোট ৩৫ হাজার ৫৭৫ টাকা কমে দাম নেমে আসে ২ লাখ ৩৪ হাজার ৮৫৫ টাকায়।
তবে মাসের শেষদিকে আবারও দাম বাড়তে শুরু করে। ২৮ ও ৩১ মার্চসহ কয়েক দফা বৃদ্ধির ফলে দাম আবার ২ লাখ ৪৪ হাজার টাকার ওপরে উঠে আসে।
রুপার দাম অপরিবর্তিত
স্বর্ণের বাজারে এত অস্থিরতার মাঝেও রুপার দামে কোনো পরিবর্তন আসেনি। বর্তমানে—
-
২২ ক্যারেট রুপা: ৫,৭১৫ টাকা
-
২১ ক্যারেট: ৫,৪২৪ টাকা
-
১৮ ক্যারেট: ৪,৬৬৬ টাকা
-
সনাতন পদ্ধতি: ৩,৪৯৯ টাকা
চলতি বছরে এখন পর্যন্ত রুপার দাম ৩০ বার সমন্বয় করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৭ বার বেড়েছে এবং ১৩ বার কমেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, ডলারের দামের পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে স্বর্ণের বাজারে এই অস্বাভাবিক ওঠানামা দেখা যাচ্ছে। তারা মনে করছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত স্বর্ণের দামে এই অস্থিরতা অব্যাহত থাকতে পারে।