রুয়েট প্রতিনিধি:
দীর্ঘদিনের স্থবিরতা, সীমাহীন দুর্নীতি ও অযৌক্তিক কালক্ষেপণের অচলাবস্থা পেরিয়ে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (রুয়েট) চলমান ‘Further Development of RUET Project’ এখন দৃশ্যমান গতিতে ফিরেছে। বিগত সময়ে ফ্যাসিবাদী শাসনামলের লুটপাট ও অব্যবস্থাপনায় থমকে থাকা এসব উন্নয়ন কাজ বর্তমানে নতুন উদ্যমে এগিয়ে চলেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তরের তথ্যমতে, ২০১৯ সালের মার্চে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের প্রাথমিক বাজেট ছিল ৫৯৯ কোটি টাকা, যা প্রজেক্ট গুলো সমাপ্ত করার জন্য ছিল অপ্রতুল। পরবর্তীতে বর্তমান প্রশাসনের সার্বিক সহায়তায় পুনরায় ডিপিপি সংশোধন করে ৬২৯ কোটি টাকায় উন্নীতকরণের পাশাপাশি প্রকল্পের সময়সীমাও দেড় বছর বাড়িয়ে আনা হয়। প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক কাজ ২০১৬ সালের নভেম্বর শুরু হলেও দীর্ঘ সময়ের প্রশাসনিক জটিলতা, দুর্নীতি ও সমন্বয়হীনতার কারণে কাজের অগ্রগতি বারবার বাধাগ্রস্ত হয়, এমনটাই জানিয়েছেন দপ্তরটির বর্তমান পরিচালক অধ্যাপক ড. এইচ এম রাসেল।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী শাসনের অবসানের পর রুয়েটের প্রকল্পগুলোর কাজ কিছু সময়ের জন্য পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়ে। এমন অবস্থায় হাল ধরেন বর্তমান প্রশাসন। তাদের সক্রিয় উদ্যোগে প্রজেক্ট গুলো আবারও গতি ফিরে পায়। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু অবকাঠামো দৃশ্যমান অগ্রগতির মুখ দেখেছে।
এসব প্রকল্পের আওতায় পুরকৌশল অনুষদ ভবনের কাজ ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৪র্থ তলা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল। বর্তমানে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ভবনটির ১০ম তলা পর্যন্ত কনস্ট্রাকশন কাজ সম্পন্ন হয় এবং অভ্যন্তরীণ ফিনিশিং কাজের অগ্রগতি ৬০শতাংশের বেশি।
ইসিই অনুষদ ভবন ও নতুন প্রশাসনিক ভবনের কাজও একসময় পুরাপুরি বন্ধ ছিল। ২০২৪ সালের আগস্টে ভবন গুলোর যথাক্রমে ৪র্থ ও ৫ম তলা পর্যন্ত কাজ শেষ হলেও বর্তমানে ১০ম তলা পর্যন্ত কনস্ট্রাকশন কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ ফিনিশিং কাজের অগ্রগতি ৬৫শতাংশে পৌঁছেছে।
একইভাবে, যন্ত্রকৌশল অনুষদ ভবনের কাজ ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৫ম তলা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল। মার্চ, ২০২৬ পর্যন্ত এটির ১০ম তলার কনস্ট্রাকশন শেষ হয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ কাজের অগ্রগতি ৬০শতাংশ ছাড়িয়েছে।
পাশাপাশি ১০তলা ইনস্টিটিউট ভবন ও শিক্ষক ডরমেটরি ভবন দুটি ক্ষেত্রেও একই ধারা লক্ষ্য করা গেছে। আগস্ট, ২০২৪ পর্যন্ত যথাক্রমে ৫ম ও ৭ম তলা পর্যন্ত কাজ এগিয়েছিল। ২০২৬ এর মার্চ মাসে ইনস্টিটিউট ভবন ১০ম তলা পর্যন্ত কনস্ট্রাকশন কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ কাজ প্রায় ৭০ শতাংশ শেষ হয়েছে।
তবে এ বছরের মার্চ মাসেই শিক্ষক ডরমেটরির কাজ সম্পূর্ণ করে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে থাকার উপযোগী এ ভবনটিতে ইতিমধ্যেই শিক্ষকদের বরাদ্দ দেয়ার জন্য আবেদন আহ্বান করা হয়েছে।
এছাড়াও ছাত্রী হল-১ ও ছাত্রী হল-২ এর কাজও নির্ধারিত সময়ের ৯ মাস আগেই সম্পন্ন হয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে ৭ম তলা পর্যন্ত চলমান থাকা এ দুটি ভবন ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের পরিবর্তে চলতি বছরের মার্চেই সম্পূর্ণ করে হস্তান্তর করা হয়েছে, যা প্রকল্প বাস্তবায়নে বর্তমান প্রশাসনের গতিশীলতা ও দক্ষতাকে ইঙ্গিত দেয়।
অন্যদিকে, ছাত্র হল-১ ও ছাত্র হল-২ এর কাঠামোগত কাজ শেষ হলেও এখনো আনুষ্ঠানিক হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানান, দ্রুত সময়ের মধ্যেই ছাত্রদের থাকা উপযোগী করে হস্তান্তর করা হবে। জানা যায়, হল দুটোতে ঠিকাদারদের কাজ না করার টালবাহানার কারণে লিফট আসতে বিলম্বিত হচ্ছিল। তবে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপের কারণে লিফগুলো নির্মাণকাজের স্থানে পৌঁছেছে এবং ইনস্টলেশন কাজও চলমান রয়েছে।
এছাড়াও স্টাফ ও অফিসার্স কোয়ার্টারের কাজ, যা ২০১৯ সালের নভেম্বর থেকে শুরু হয়ে দীর্ঘদিন ধীরগতিতে চলছিল, সেটিও ২০২৬ সালের মার্চ নাগাদ ব্যবহার উপযোগী অবস্থায় আনা হয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো থেকে এবং সরেজমিনে প্রকল্প পরিদর্শনে লক্ষ্য করা যায়, দৃশ্যমান অগ্রগতি গুলোতে বর্তমান প্রশাসনের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. এইচ, এম, রাসেলের দৃঢ় নেতৃত্ব,সুদৃঢ় প্রচেষ্টা ও সুদীপ্ত কলাকৌশলের ফলাফল। তার নেতৃত্বে অক্লান্ত পরিশ্রম,প্রজেক্টসমূহ সমন্বয়ের দক্ষতা এবং গভীর পর্যবেক্ষণের ফলশ্রুতিতে একটি উন্নত ও কাঙ্ক্ষিত ক্যাম্পাস দেখার স্বপ্ন দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সার্বিক বিষয়ে ড. এইচ এম রাসেল বলেন, "দীর্ঘদিনের স্থবিরতা, সীমাহীন দুর্নীতি, বেশ কিছুদিন রুয়েটে ভিসি না থাকা ও পূর্বের বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে বর্তমান প্রশাসন উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে সক্ষম হয়েছে।" সীমিত সম্পদ ও সময়ের মধ্যেও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনায় বর্তমানের দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি আরও জানান, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী সহ সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য নির্মিত এসব উন্নয়নকাজ এখন বাস্তব রূপ নিচ্ছে। অবশিষ্ট কাজ দ্রুত সম্পন্ন করে নির্ধারিত সময় অর্থাৎ এ বছরের ৩১শে ডিসেম্বরের আগেই সবার জন্য অবকাঠামোগুলো হস্তান্তর করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অবকাঠামো ও উন্নয়ন সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও ফ্যাসিবাদী প্রশাসনের সীমাহীন দুর্নীতির কারণে পিছিয়ে পড়া প্রকল্পগুলো সম্পন্ন হলে রুয়েটের একাডেমিক ও আবাসিক পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে এবং শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত হবে।