৩২ বছরের শিক্ষকতাকে সম্মান, বিদায়ে লাল গালিচা ও মোটরসাইকেল উপহার

Date: 2026-04-17
news-banner

মোঃ মাহমুদুল হাসান বাবু , পঞ্চগড় প্রতিনিধি :

পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাড়িভাসা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান শিক্ষক মো. শামস কিবরিয়া প্রধানের অবসরজনিত বিদায় উপলক্ষে আয়োজন করা হয় ব্যতিক্রমধর্মী ও রাজকীয় সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। দীর্ঘ ৩২ বছরের শিক্ষকতা জীবনের সম্মান জানাতে বিদ্যালয় মাঠে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ, আবেগ আর শ্রদ্ধার অনন্য মিলন।

বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) বিকেলে বিদ্যালয় মাঠে শিক্ষক-কর্মচারী, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, সাবেক শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয় এই বিদায় সংবর্ধনা।

অনুষ্ঠানে বিদায়ী প্রধান শিক্ষককে উপহার হিসেবে প্রদান করা হয় একটি হোন্ডা এসপি ১২৫ মোটরসাইকেল। পাশাপাশি বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থী, অভিভাবক, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা ক্রেস্ট, ফুল, উপহার সামগ্রী দিয়ে তাকে সম্মান জানান।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পঞ্চগড় সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাহমিদা সুলতানা।
সভাপতিত্ব করেন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও শহীদ জিয়াউর রহমান ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মোমেনুর রহমান প্রধান। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা লুৎফুল কবির, উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু দাউদ প্রধান, হাড়িভাসা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান স্যাইয়েদ নুর-ই-আলম, বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাহজেবিন মনসুর প্রমুখ।

আলোচনা সভা শেষে অতিথিরা বিদায়ী প্রধান শিক্ষকের হাতে মোটরসাইকেলের চাবি তুলে দেন। এরপর বিদ্যালয় মাঠে লাল গালিচা বিছিয়ে তাকে মোটরসাইকেলে বসানো হয়। শিক্ষকরা মোটরসাইকেলটি ঠেলে ঠেলে মাঠ থেকে মূল সড়কে নিয়ে যান। এ সময় শিক্ষার্থীরা হাততালি দিয়ে তাকে বিদায় জানায়। পরে শিক্ষকরা তাকে মাইক্রোবাসে করে বাড়িতে পৌঁছে দেন।
এই দৃশ্য দেখে অনেক সাবেক শিক্ষার্থী আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। বিদ্যালয় চত্বরে তৈরি হয় এক উৎসবঘন ও হৃদয়স্পর্শী পরিবেশ।

বিদায়ী প্রধান শিক্ষক শামস কিবরিয়া প্রধান বলেন, আমি জীবনের সবচেয়ে বড় সময়টা এই বিদ্যালয়ের জন্য দিয়েছি। আজকের এই সম্মান আমাকে আবেগে ভাসিয়ে দিয়েছে। শিক্ষকতা শুধু চাকরি নয়, এটি দায়িত্ব ও ভালোবাসার জায়গা।

তিনি আরও বলেন, বিদ্যালয়টি আমার কাছে সন্তানের মতো। আমি অবসরে গেলেও এই প্রতিষ্ঠানের জন্য আমার দোয়া থাকবে সবসময়।

দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী লাবণ্য জানায়, স্যার আমাদের শুধু পড়ালেখা নয়, শৃঙ্খলা ও ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন। উনি চলে যাচ্ছেন শুনে খুব কষ্ট লাগছে।

সাবেক শিক্ষার্থী রইসুন নাহার বলেন, এই স্কুলের ভিত গড়েছেন শামস কিবরিয়া স্যার। তার হাত ধরেই আমরা অনেকেই উচ্চশিক্ষায় এগিয়ে গেছি। আজকের সংবর্ধনা আসলে তার প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাহজেবিন মনসুর বলেন, আজকের এই আয়োজন আমাদের বিদ্যালয়ের জন্য একটি গর্বের মুহূর্ত। শামস কিবরিয়া প্রধান শুধু একজন প্রধান শিক্ষক ছিলেন না, তিনি ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানের প্রাণ। তার দীর্ঘ ৩২ বছরের নিষ্ঠা, পরিশ্রম ও নেতৃত্বে বিদ্যালয়টি আজ একটি মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তার অবদান আমরা কখনোই ভুলতে পারব না। আমরা তার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ফাহমিদা সুলতানা বলেন, একজন শিক্ষক জাতি গঠনের কারিগর। আমি অনুষ্ঠানে সবার বক্তব্যে জানলাম শামস কিবরিয়া প্রধান দীর্ঘদিন নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। আজকের আয়োজন প্রমাণ করে-শিক্ষক যদি দায়িত্বশীল হন, মানুষ তাকে আজীবন মনে রাখে।

জানা গেছে, শামস কিবরিয়া প্রধান ১৯৯৩ সালে বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। দীর্ঘ ৩২ বছর দায়িত্ব পালনের পর তিনি গত বছরের ৮ মার্চ অবসরে যান। তার কর্মজীবনে বিদ্যালয়টি এলাকায় একটি পরিচিত ও মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠে।
এই প্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা করে অনেক শিক্ষার্থী বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। এছাড়া বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের গোলরক্ষক ইয়ারজান ও সোনালী আক্তারও পড়াশোনা করেছেন বলে জানা গেছে।

Leave Your Comments