নিজস্ব প্রতিবেদক,
চারদিকে পানি, অথচ পান করার মতো এক ফোঁটা জলও যেন সহজলভ্য নয়—এমনই নির্মম বাস্তবতায় দিন কাটছে সাতক্ষীরার উপকূলীয় উপজেলা শ্যামনগরের মানুষের। লবণাক্ততায় আক্রান্ত এই জনপদে সুপেয় পানির জন্য প্রতিদিনের সংগ্রাম যেন বেঁচে থাকার অনিবার্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভোরের আলো ফোটার আগেই মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের জেলেখালি গ্রামের একটি পানির ট্যাপের সামনে জড়ো হন শত শত মানুষ। কারও হাতে কলসি, কারও হাতে প্লাস্টিকের ড্রাম—দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা তাদের নিত্যদিনের চিত্র। দুই থেকে তিন কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে কেউ হেঁটে, কেউবা সাইকেলে এসে দাঁড়ান এই একমাত্র পানির উৎসের সামনে।
সেই লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ১৬ বছর বয়সী এসএসসি পরীক্ষার্থী সাথী মিস্ত্রি বলে, ‘জল না নিলে খাব কী?’—তার এই কথাতেই যেন ফুটে ওঠে পুরো এলাকার বাস্তবতা। একইভাবে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী স্বরলিকা মণ্ডল জানায়, স্কুলে না গেলেও চলে, কিন্তু প্রতিদিন দুবার পানি আনতে না এলে উপায় নেই।
পানির কষ্ট শুধু শিশু-কিশোরদের নয়, প্রবীণদের জীবনেও সমানভাবে দাগ কেটেছে। ৬৫ বছর বয়সী কবিতা গাইন পাশের নদী সাঁতরে এসে লাইনে দাঁড়ান। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও কখনো কখনো খালি হাতেই ফিরতে হয় তাকে। তিনি বলেন, চার দশক ধরে এই কষ্ট সহ্য করে আসছেন। এমনকি পানির সংকটের কারণে এলাকায় বিয়ের সম্পর্ক পর্যন্ত ভেঙে যায়।
একই চিত্র দেখা যায় ধুমঘাট এলাকার শেফালি রানী মণ্ডলের জীবনেও। প্রতিদিন তিন কিলোমিটার পথ হেঁটে এবং নদী সাঁতরে পানি সংগ্রহ করতে হয় তাকে। এতে দিনের বড় একটি অংশই চলে যায় শুধু পানির খোঁজে।
এই সংকটের মধ্যেও কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে একটি ছোট উদ্যোগ। জেলেখালির ত্রিপানি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পুকুরের পানি পরিশোধন করে ট্যাংকের মাধ্যমে কয়েকটি গ্রামে সরবরাহ করা হচ্ছে। একটি বেসরকারি সংস্থার সহায়তায় সকাল-বিকেল নির্দিষ্ট সময়ে ট্যাপ থেকে পানি নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন স্থানীয়রা।
তবে এই উদ্যোগ পর্যাপ্ত নয়। জেলেখালি, ধুমঘাট, কুলতলি, কচুখালি, হাসারচকসহ আশপাশের বহু এলাকার মানুষ এই এক উৎসের ওপর নির্ভরশীল। পুরো শ্যামনগর উপজেলাজুড়েই সুপেয় পানির সংকট একই রকম প্রকট।
পরিবেশকর্মীরা বলছেন, লবণাক্ততার বিস্তার, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া এবং বৃষ্টির অভাব—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হচ্ছে। বিশেষ করে এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত সময়টাতে সংকট চরমে পৌঁছায়।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এলাকায় হাজার হাজার পানির উৎস থাকলেও অনেকগুলোই অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ফলে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ মানুষ সুপেয় পানির অভাবে ভুগছেন।
শ্যামনগর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান জানান, এ সংকট নিরসনে পুকুর খনন, পানি সংরক্ষণ এবং বিকল্প উৎস তৈরির জন্য বিভিন্ন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। তবে বাস্তবতার নিরিখে তা এখনো পর্যাপ্ত নয়।
জলবেষ্টিত এই জনপদে তাই প্রতিটি ফোঁটা সুপেয় পানি এখনও এক মূল্যবান সম্পদ—যার জন্য প্রতিদিন লড়াই করে বেঁচে থাকতে হয় হাজারো মানুষকে।