বিশ্বজুড়ে নানা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার এবং রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়া সফরে গেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। শনিবার গভীর রাতে তিনি এ সফরের উদ্দেশে রওনা হন।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে, ইউক্রেন যুদ্ধও থামার কোনো লক্ষণ নেই। এমন পরিস্থিতিতে সম্প্রতি ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকা সফর করেছেন রুবিও। যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচার চলার মধ্যেই তিনি বিদেশ সফর বাড়িয়েছেন।
ইরান, ইউক্রেন ও গাজা পরিস্থিতির মতো জটিল বিষয়গুলোর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব অনেকটাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন রুবিও। এর পরিবর্তে তিনি বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ ও আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব জোরদারে মনোযোগ দিচ্ছেন।
উজবেকিস্তান সফরে রুবিওর সঙ্গে প্রায় ২০০ জন ব্যবসায়ী নেতার একটি বড় প্রতিনিধিদল রয়েছে। সোমবার সেখানে মধ্য এশিয়ার পাঁচটি দেশের মন্ত্রীদের নিয়ে আয়োজিত বৈঠকে অংশ নেবেন তিনি।
সফরের আগে রুবিও বলেন, ‘এই সম্পর্কটি গুরুত্বপূর্ণ।’ সফরটিকে কৌশলগত উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘এমন কিছু দেশ রয়েছে, যাদের সঙ্গে আমরা সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাই এবং সম্পর্ক আরও জোরদার করতে আগ্রহী।’
শুক্রবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান, এ সফরের মাধ্যমে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে ক্রমবর্ধমান অংশীদারত্বের বিষয়ে ওয়াশিংটনের সদিচ্ছা তুলে ধরছেন রুবিও। বিশেষ করে জ্বালানি খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মধ্য এশিয়া প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ একটি বিশাল অঞ্চল। আয়তনের দিক থেকে এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রায় সমান হলেও অঞ্চলটির জনসংখ্যা মাত্র প্রায় ৮ কোটি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের আরেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা কয়েক মাস ধরে এই সফরের পরিকল্পনা করছি। বিশ্বের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি ও সম্পৃক্ততা বাড়ানোর জন্য এটি অসাধারণ সুযোগ।’
মধ্য এশিয়ায় রাশিয়া-চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা: উজবেকিস্তানের ঐতিহাসিক শহর সমরকন্দ সফরের সময় রুবিও ‘সি৫+১’ বৈঠকে অংশ নেবেন। ঐতিহাসিক সিল্ক রোডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই শহরে কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তানের মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করবেন তিনি।
২০২৫ সালের নভেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই পাঁচ দেশের নেতাদের হোয়াইট হাউসে স্বাগত জানিয়েছিলেন।
সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত এই পাঁচ দেশের সঙ্গে এখনো রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। জ্বালানি পরিবহনের পাইপলাইন, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং অভিবাসনব্যবস্থার মাধ্যমে দেশগুলোর সঙ্গে মস্কোর সম্পর্ক বজায় রয়েছে।
তবে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর মধ্য এশিয়ায় রাশিয়ার প্রভাব কিছুটা কমেছে। সেই সুযোগে নিজেদের প্রভাব বাড়িয়েছে চীন।
বর্তমানে মধ্য এশিয়ার পাঁচটি দেশেরই প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার চীন। দেশটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ খাতে একাধিক চুক্তি করেছে। এর মধ্যে তুর্কমেনিস্তান থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস, কাজাখস্তান থেকে ইউরেনিয়াম এবং তাজিকিস্তান থেকে বিরল মৃত্তিকা খনিজ সংগ্রহের উদ্যোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, বিরল মৃত্তিকা খনিজের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনার বিষয়টিকে নিজেদের পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র।
ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর, যিনি মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূতের দায়িত্বও পালন করছেন, এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক আরও উন্নত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বারবার তুলে ধরেছেন।
ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির চেষ্টা: উজবেকিস্তান সফর শেষে রুবিও ভারত যাবেন। সেখানে মুম্বাই এবং গুজরাট রাজ্যের জামনগর শহর সফরের কথা রয়েছে তার। দুটি নগরই গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকেন্দ্র এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান বন্দরনগরী হিসেবে পরিচিত।
চলতি বছরে এটি হবে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক জোরদারে রুবিওর দ্বিতীয় সরকারি সফর। এর আগে মে মাসে তিনি নয়াদিল্লি ও কলকাতা সফর করেছিলেন। ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দ্বিতীয় জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা চুক্তির খুব কাছাকাছি রয়েছি।’
গত কয়েক মাস ধরে দুই দেশের মধ্যে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত ভারতীয় পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্ক কমানোর লক্ষ্যে একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছেছিল।
কিন্তু এর কয়েক দিন পর মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আরোপ করা বেশ কয়েকটি শুল্ক বাতিল করে দেন। এতে দুই দেশের সম্ভাব্য বাণিজ্য চুক্তি কবে কার্যকর হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এরপর থেকে ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের তেল কেনার প্রতিবাদে ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিলেন। এতে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। তবে পরে ওই শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে।
মুম্বাই ও জামনগর সফরের সময় ভারতীয় ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন রুবিও। এসব বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ‘বাণিজ্যিক কূটনীতি’র ধারণা তুলে ধরবেন তিনি। এর মূল লক্ষ্য হলো কূটনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ করা।
এ সফরে ভারতের বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের টেক্সাসে একটি তেল শোধনাগার স্থাপনে অর্থায়নের পরিকল্পনাও আলোচনায় আসবে। ভারতীয় ধনকুবের অনন্ত আম্বানির নেতৃত্বাধীন এই শিল্পগোষ্ঠীর পরিকল্পনাটি যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের জ্বালানি সহযোগিতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।