মৃত্যুর পর একজন মানুষের শেষ ঠিকানা হয় একটি কবর। জীবনের সব পরিচয়, অহংকার, বিরোধ, অভিমান ও রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে শেষ বিদায়ে মানুষটিকে মাটির কাছে ফিরিয়ে দেওয়াই মানবিকতার সবচেয়ে স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু পিরোজপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মৃত্যুর পর যে ঘটনা সামনে এসেছে, তা শুধু পরিবারের বেদনার গল্প নয়, বরং আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক বিবেকের কাছেও রয়ে গেল কঠিন প্রশ্ন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলায় বাদী হিসেবে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য এ ঘটনা ঘটে।মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী ৮৭ বছর বয়সে শনিবার সকালে গোপালগঞ্জে তাঁর মেয়ের বাড়িতে মারা যান। রাষ্ট্রীয় তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়েছে। এরপর রাতে তার দাফন সম্পন্ন হয়। কিন্তু সেই দাফনকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিও মানুষকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।
ছবিতে দেখা গেছে, একজন বাবার শেষ ঠিকানার জন্য তার মেয়েরা ও বোনেরা মোবাইল ফোনে আলো দিয়ে নিজেরাই কবর খুঁড়ছেন। দৃশ্যটি যতটা সরল, তার ভেতরের বেদনা ততটাই গভীর। যে মেয়েরা হয়তো বাবার হাত ধরে জীবনের পথ চলেছেন, বাবার কাছ থেকে আদর পেয়েছেন, আজ সেই বাবার জন্য তাদের হাতেই মাটি খুঁড়তে হয়েছে। একজন বাবার এর চেয়ে হৃদয়বিদারক বিদায় আর কি হতে পারে?
মরহুমের পরিবারের পক্ষ থেকে স্থানীয় সাংবাদিকদের জানিয়েছে, প্রথমে তার জন্য একটি কবর খোঁড়া হয়েছিল। পরে একদল ব্যক্তি সেই কবর ভরাট করে দেয়। এরপর মেয়েরা তাদের ফুফুদের নিয়ে বাড়িতেই নতুন করে কবর খোঁড়েন। তবে অভিযোগটি সত্য হলে প্রশ্ন হলো, একজন মৃত মানুষের সঙ্গে এমন আচরণের কারণ কি? জীবিত অবস্থায় মতের অমিল থাকতে পারে, রাজনৈতিক বিরোধ থাকতে পারে, মামলা নিয়ে দ্বন্দ্ব থাকতে পারে। কিন্তু মৃত্যুর পরও কি সেই বিরোধের হিসাব মেলাতে হবে?
অন্যদিকে দেলোয়ার হুসেইন সাঈদীর পুত্র জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী বিবিসিকে দেওয়া এক বক্তব্যে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার দাবি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ওই ব্যক্তিকে ঘিরে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনা ছিল, তবে তারা জনগণকে শান্ত করেছেন এবং কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। তার দাফনেও কোনো বাধা দেওয়া হয়নি। স্থানীয় প্রশাসনও জানিয়েছে, রাষ্ট্রীয় তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়েছে এবং রাতে তার দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্যের সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার। তবে এর বাইরেও আমাদের সামনে একটা প্রশ্ন থেকে যায়। একজন মানুষ মারা যাওয়ার পর তার কবর খোঁড়ার অধিকারটুকুও কি তার পরিবারের থাকবে না?
মানিক পশারী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কি না, তাকে নিয়ে কারও রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত ক্ষোভ ছিল কি না, কিংবা অতীতের কোনো মামলায় তিনি কি ভূমিকা রেখেছিলেন, এসব প্রশ্নের বিচার ইতিহাস ও আইন করবে। কিন্তু মৃত্যুর পর একজন মানুষকে দাফন করার অধিকার কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর করতে পারে না।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, বাবার শেষ বিদায়ের মুহূর্তে মেয়েদের হাতে থাকার কথা ছিল ফুল, কাফনের কাপড় কিংবা চোখে পানি। সেখানে তাদের হাতে উঠেছে কোদাল। তারা নিজেরাই বাবার কবর খুঁড়েছেন। এই দৃশ্য শুধু পরিবারের শোক প্রকাশ করে না, আমাদের সমাজের ভেতরে জমে থাকা বিভাজনের নির্মম প্রতিচ্ছবি হয়েও দাঁড়ায়।
রাজনীতি থাকবে, মতের পার্থক্য থাকবে, ইতিহাসের নানা ব্যাখ্যাও থাকবে। কিন্তু মৃত্যুর পর মানুষটি শুধু একজন মৃত মানুষ। তার পরিচয়ের আগে তার মানবিক অধিকারটুকু মনে রাখা কি আমাদের দায়িত্ব নয়?
আজ মানিক পশারী নেই। তার রাজনৈতিক পরিচয়, মামলার বাদী ও স্বাক্ষীর ভূমিকা ঘিরে আজকের বিতর্ক একদিন ইতিহাসের পাতায় চলে যাবে।
কিন্তু বাবার কবর খুঁড়তে বাধ্য হওয়া মেয়েদের সেই ছবিটি হয়তো অনেক দিন মানুষের মনে থেকে যাবে। সেই ছবি আমাদের একটি কথাই মনে করিয়ে দিবে, মানুষের সঙ্গে মানুষের বিরোধ যতই গভীর হোক, মৃত্যুর পর অন্তত মাটির নিচে যাওয়ার পথটুকু যেন আর কারও জন্য বন্ধ না হয়।