আব্দুল্লাহ আল মামুন (ঢাকা ব্যুরো প্রধান): রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে যত্রতত্র শিশুখাদ্যসহ বিভিন্ন ধরনের বেকারি খাদ্য সামগ্রী উৎপাদনের অনুমোদনহীন কারখানা গড়ে উঠছে। মানুষের মৌলিক চাহিদার মধ্যে খাদ্য একটি প্রধান ও অন্যতম মৌলিক চাহিদা। জীবন ধারণের জন্য খাদ্যের কোনো বিকল্প নেই। সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রতিটি মানুষের প্রয়োজন বিশুদ্ধ ও পুষ্টিকর খাবার। আর এ বিশুদ্ধ খাদ্য সুস্থ ও সমৃদ্ধশালী জাতি গঠনে একান্ত অপরিহার্য। কিন্তু এই বিশুদ্ধ খাবার প্রাপ্তি দিনেদিনে কঠিন হয়ে যাচ্ছে কিছু অসাধু ও বিবেকহীন ব্যবসায়ীদের কারনে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও যেন এদের নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে।
কামরাঙ্গীরচরে বিভিন্ন অলিতে-গলিতে গড়ে উঠেছে এই ধরনের বিবেকহীন ব্যবসায়ীদের দ্বারা পরিচালিত খাদ্যদ্রব্য উৎপাদনের বেশকিছু অবৈধ কারখানা। কালি-ঝুলি মাখা এই সমস্ত কারখানাগুলোর ভেতরে-বাইরে ময়লা-আবর্জনাযুক্ত নোংরা পরিবেশ। দুর্গন্ধের ছড়াছড়ি। মশা-মাছির ভনভন আর একাধিক কাঁচা-পাকা টয়লেটের অবস্থান। পর্যাপ্ত আলো বাতাসের ব্যবস্থা না থাকায় রাত-দিন দম বন্ধ হওয়া গরমে ঘেমে চুপসানো অবস্থায় খালি গায়ে সেখানে বেকারি শ্রমিকরা আটা-ময়দা দলিত মথিত করে থাকে। সেখানেই তৈরি হয় ব্রেড, বিস্কুট, কেকসহ নানা লোভনীয় খাদ্যপণ্য। অভিযোগ আছে উৎপাদন ব্যয় কমাতে এসব বেকারির খাদ্যপণ্যে ভেজাল আটা, ময়দা, ডালডা, তেল ও পচা ডিমসহ নিম্ন মানের বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। বেকারির কারখানায় উৎপাদিত খাদ্যদ্রব্য সতেজ রাখতে ট্যালো, ফ্যাটি এসিড ও ইমউসাইল্টিং, টেক্সটাইল রঙসহ নানা কেমিক্যালও ব্যবহার করা হয় বলে জানা যায়। বিএসটিআই এর অনুমোদন ছাড়াই তাদের লোগো ব্যবহার করে মানহীন অস্বাস্থ্যকর এসব পণ্য স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে।
কামরাঙ্গীরচর থানাধীন ঝাউলাহাটি এলাকায় মেম্বার বাড়ির সামনে কাওসার গলিতে এ ধরনের একটি বিস্কুট কারখানার সন্ধান পাওয়া গেছে। জানা যায়, “রবিন ফুড প্রোডাক্টস্” নামের এই কারখানাটির মালিকের নাম মো. জসিম। “রবিন ফুড প্রোডাক্টস্” “গ্রামীণ চানাচুর” নামেও পরিচিত। সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ৪ জন শ্রমিক ব্যস্ত হাতে বিস্কুট তৈরীর কাজ করছে। কারো হাতেই হ্যান্ড গ্লাভস নাই। গায়ে নাই এপ্রোন কিংবা এই কাজের জন্য উপযুক্ত বা সুনির্দিষ্ট কোনো পোশাক। উপরন্তু তারা কেউ লুঙ্গি পড়ে, কেউ গামছা পড়ে এবং গেঞ্জি গায়ে টিন শেডের ময়লা ফ্লোরে খালি পায়ে হাটাচলা করছে আর খাদ্য উৎপাদনের কাজ করে যাচ্ছে। খাদ্য উৎপাদনের বিভিন্ন উপাদানের পাশেই রাখা রয়েছে তাদের পায়ের স্যান্ডেল।
তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এখানে তারা মূলত সল্টেস্ট বিস্কুট, মিষ্টি বিষ্কুট, টোস্ট বিস্কুট, চানাচুর, ডাল ও বুট ভাজাসহ মনেক্কা নামের এক ধরনের খাদ্য দ্রব্য উৎপাদন করে থাকে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী প্রতিদিন এই কারখানায় শুধুমাত্র বিস্কুটই উৎপাদন করা হয় ৩০০ কেজি। এখানকার পন্য দক্ষিণাচ্ঞলসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করা হয়। উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ ছাড়াই ১০ কেজি ওজনের বিস্কুটের পলিথিনের বস্তায় “রবিন ফুড প্রোডাক্টস্” এর রঙ্গীন স্টিকার ঢুকানো রয়েছে। স্টিকারে প্রস্তুতকারক হিসেবে “রবিন ফুড প্রোডাক্টস্” এর নাম লেখা থাকলেও ঠিকানা লেখা রয়েছে ‘ঢাকা বাংলাদেশ।’ অর্থাৎ এটি রাজধানী শহর ঢাকায় প্রস্তুত, কিন্তু ঢাকার কোথায়, তা খুঁজে বের করার সাধ্য কারো নেই। পণ্যের গায়ে সেই স্টিকারে আরও লেখা রয়েছে, ‘পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও গুণগত মান সম্পন্নভাবে প্রস্তুত।’ অথচ গুণগত মান সম্পন্ন কিনা সেটি যাচাই সাপেক্ষে যারা অনুমোদন দেবেন, সেই বিএসটিআই এর লাইসেন্সই নেই তাদের। মজার বিষয় হচ্ছে, কোনো রকম অনুমতি ছাড়াই তারা তাদের পণ্যের স্টিকারে বিএসটিআই এর লোগো ব্যবহার করছে এবং তার নিচে একটি ক্রমিক নম্বরও ব্যবহার করছে। যা দেখে সাধারন মানুষ প্রতিনিয়ত প্রতারিতই হচ্ছে।
এ বিষয়ে কারখানা মালিক মো. জসিমের সাথে মুঠোফোনে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমাদেরতো বিএসটিআই এর কাগজ হয় না, অর্থাৎ তারা (বিএসটিআই) আমাদেরকে কাগজ দেয় না।” তাহলে আপনি আপনাদের পণ্যের গায়ে বিএসটিআই এর লোগো ব্যবহার করছেন কিভাবে? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “এগুলোতো এখন এভ্যাইলএবল, সবাই ব্যবহার করে।” এক পর্যায়ে তিনি এই প্রতিবেদককে ম্যনেজ করার ব্যর্থ চেষ্টাও করেন। তিনি জানতে চান প্রতিবেদকের মুঠোফোন নাম্বারটি বিকাশ করা আছে কিনা!
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, এসব বেকারিতে অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে তৈরি বিস্কুট, চানাচুর, কেক, পাউরুটি, মিষ্টি, সন্দেশ ও মনেক্কাসহ বিভিন্ন ধরনের মুখরোচক খাবার পাড়া-মহল্লার দোকান থেকে শুরু করে নামি-দামি দোকানেও বিক্রি হচ্ছে। কখনও কেউ ভেবে দেখেছে না এই খাবারগুলো কোথা থেকে আসছে। কোথায় তৈরি হচ্ছে? কী দিয়ে তৈরি হচ্ছে? এসব খাদ্য পণ্যের মাননিয়ন্ত্রণ ও যাচাই করার দায়িত্বে যারা আছেন তারা সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করছেন না বলে অভিযোগ সচেতনমহলের।