আব্দুল্লাহ আল মামুন (ঢাকা ব্যুরো প্রধান): জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ‘মুজিববর্ষ’ উদযাপন উপলক্ষে গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচির সফল বাস্তবায়ন হয়েছে। এ উপলক্ষে সারাদেশ যেমন নতুনরূপে সেজেছে, তেমনি দেশের মানুষ হৃদয়ের গহীনে এক অন্যরকম উৎসব আনন্দে মেতেছে। কিন্তু সেই ‘জাতীয় আনন্দ উৎসবে’ নিজের মনকে রাঙাতে পারেনি একজন। ‘মুজিববর্ষ’ তার জীবনে হরিষে-বিষাদে পরিনত হয়েছে। যে শুধু নিরবে নিভৃতে কেঁদেছে। আর ন্যায় বিচারের আশায় উপর মহলের দ্বারপানে চেয়ে রয়েছে। এটি গণপূর্তের ঠিকাদার পল্টন দাস ওরফে পল্টুর কথা। পল্টু বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় আজিমপুর গণপূর্ত বিভাগ থেকে ই-জিপিতে দাখিলকৃত দরপত্রের মাধ্যমে একটি কাজ পায়। যার গৃহীত দর ছিল ১৩ লক্ষ ৬৩ হাজার ১ শত বাহান্ন টাকা আট নয় সাত পয়সা মাত্র। এর অনুকূলে নির্ধারিত কাজ শেষে বিল তুলতে গিয়ে চাহিদা অনুযায়ী অবৈধ আবদার মিটাতে না পারার কারনে বড় কর্তার রোষানলে পড়ে পল্টুর হৃদয়ে যে ক্ষতের তৈরি হয়, দিনেদিনে তা ফুলে-ফেঁপে বেশ বড় হতে চলেছে বলে জানা যায়।
ঘটনার বিবরণে জানা যায় যে, ভুক্তভোগী ঠিকাদার মেসার্স এম.এ.আলী এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার পল্টন দাস ওরফে পল্টু বিগত ১৬ ফেব্রুয়ারী-২০২০ খ্রিঃ তারিখ বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ‘মুজিববর্ষ’ উপলক্ষে কর্মপরিকল্পনার আওতায় পরিচ্ছন্ন গ্রাম পরিচ্ছন্ন শহর কার্যক্রমের অধীন ঢাকাস্থ আজিমপুর সরকারি কলোনীর (মৌচাক/ দক্ষিনাঞ্চল) ৯ টি ভবনের ফেস লিফটিং, সীমানা প্রাচীর ও গাছ রংকরণ এবং আবাসিক এলাকা পরিষ্কারকরণসহ আনুষাঙ্গিক কাজের কার্যাদেশ পায়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ১৩ লক্ষ ৬৩ হাজার টাকার এই কাজ শেষ করে বিল উঠাতে গেলে আজিমপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইলিয়াস আহমেদ তার কাছে ২ লক্ষ টাকা ঘুষ দাবী করেন। এ সময় ঠিকাদার পল্টু ছোট কাজের বিপরীতে এত টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে প্রকৌশলী ইলিয়াস উক্ত বিলের শতকরা হিসেবে ১০% টাকা দাবী করেন। একদিকে অবৈধ আবদারে বড় অংকের টাকার দাবী, অন্যদিকে এই আবদার রক্ষা করতে না পারলে কাজের পুরো বিলটি আটকে যেতে পারে ভেবে এক পর্যায়ে পল্টু তাকে ৫৫ হাজার টাকা দিতে রাজি হয়। এবং নগদ ‘হ্যান্ড টু হ্যান্ড’ ইলিয়াসকে এই টাকা পরিশোধও করে দেয় সে। এরপরও বিলের জন্য তাকে আড়াই বছর ঘুরতে হয় বলে জানায় ভুক্তভোগী ঠিকাদার পল্টু দাস।
পল্টুর ভাষায় “জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ‘মুজিববর্ষ’ উদযাপন উপলক্ষে বিভিন্ন কাজের ক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যথেষ্ট পরিমাণ বরাদ্দ দিয়ে রাখলেও ইলিয়াস (নির্বাহী প্রকৌশলী) আমাকে প্রায় আড়াই বছর ঘুরাইয়া বিল পরিশোধ করছে, শুধুমাত্র চাহিদা মাফিক ঘুষ না দেয়ার কারনে।” পল্টু আরও বলেন, “এই কাজটি চলমান অবস্থায় আমি একটি দূর্ঘটনার শিকার হই, যেজন্য আমার একটি চোখে সমস্যা হয়। ঘটনাটি আমি তাকে (ইলিয়াস) প্রথমে মৌখিকভাবে ও পরবর্তীতে লিখিতভাবে জানিয়ে চোখের জরুরী চিকিৎসা করাতে হবে বলে আমার কাজের বিল পরিশোধের আবেদন করি। তখন তিনি আমাকে বলেন যে, আমাকে টাকা না দিয়ে একটা ফারিন্দাও বিল নিতে পারে না, আর তুমিতো পল্টু। ঐ সময় আমি নিরুপায় হয়ে তাকে ঐ ৫৫ হাজার টাকা ঘুষ দিলে সে আমাকে ৫০% বিল পরিশোধ করে। বাকি বিলের জন্য আমাকে তার কাছে বারবার ধর্ণা দিতে হয় প্রায় আড়াই বছর সময় ধরে।”
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায় যে, গণপূর্তের আজিমপুর বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইলিয়াস আহমেদের যে কোন অপকর্মের বিষয়ে তার সেকেন্ড ইন কমান্ড আজিমপুর গণপূর্তের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী কায়সার কবির সমাধান করে থাকেন। এই কায়সার কবির ইলিয়াসের ক্যাশিয়ার হিসেবেও কাজ করেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া এসও. আব্দুল্লাহ আল মামুন ইলিয়াসের নির্দেশে সকল প্রকার টেন্ডার দিয়ে থাকেন এবং সকল গোপন কাজকর্মের হিসাব-নিকাশ করে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নির্বাহী প্রকৌশলী ইলিয়াস আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও ঠিকাদারকে হয়রানি করায় প্রধান প্রকৌশলী, গণপূর্ত বিভাগ, সেগুনবাগীচা, ঢাকা বরাবরে বিগত ২৯/০৩/২০২২ খ্রিঃ তারিখ ভুক্তভোগী ঠিকাদার পল্টু একটি লিখিত অভিযোগ করেন। কিন্তু সেখানেও পল্টুর সাথে ঘটে যায় এক তেলেসমাতি কান্ড। তার ‘অভিযোগপত্রটি সেখান থেকে গায়েব হয়ে যায়।’ পল্টু বলেন, “কেউ যখন বিভাগীয় প্রধানের কাছে অভিযোগ করবে, তখন বিভাগীয় প্রধান আগে তাকে জিজ্ঞেস করবে! কিন্তু আমি লিখিত অভিযোগ করলাম, আর প্রধান প্রকৌশলী বিষয়টি জানেন না! এদিকে ইলিয়াছ সাহেবের সাথে দেখা হলে তিনি আমাকে এই বলে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন যে, ‘তোমার মত ছেলে যদি আমার ক্ষতি করতে পারো, আমার ক্ষতি হওয়া উচিত।’ এতে আমি বেশ অবাক হলাম। অতঃপর খোঁজ নিয়ে জানলাম যে, আমার অভিযোগপত্রটি জায়গা মত পৌঁছে নাই। পরবর্তীতে আমি প্রধান প্রকৌশলীর স্টাফ অফিসার মাহফুজুল আলমকে বিষয়টি জানালাম যে, স্যার আমি একটা অভিযোগ দিয়েছি, পরপর দুইবার, কিন্তু ইলিয়াস সাহেব আমাকে চ্যালেঞ্জ করলেন। তখন তিনি বললেন ‘আমরা বিষয়টি দেখব, আপনি যে আমাদের দপ্তরে অভিযোগ দিয়েছেন তার প্রমান সমেত অভিযোগপত্রটির একটি ফটোকপি দেন।’ আমি তখন প্রধান প্রকৌশলীর অফিসের নিচ তলায় রেজিষ্টারের একটা ফটোকপি সংগ্রহ করে ওনাকে (স্টাফ অফিসার) দিলে তিনি তা গ্রহন করেন। সেখানে উল্লেখিত স্মারক ও তারিখে অত্র অফিসে আমার অভিযোগপত্রটি রিসিভ হয়েছে বলে আমি তাঁকে জানালাম। পরবর্তীতে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ পেতে থাকলে আমার করা অভিযোগের প্রেক্ষিতে তারা একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। তদন্ত কমিটি যেদিন গঠন করা হয়, তার আনুমানিক তিনদিন পর লালবাগ থানায় গিয়ে আমার বিরুদ্ধে উনি (ইলিয়াস) একটি চাঁদাবাজির অভিযোগ দিয়ে তার অধিনস্ত কায়সার কবির ও আব্দুল্লাহ আল মামুনের মাধ্যমে আমাকে নানাভাবে এই বলে ভয়-ভীতি দেখাচ্ছেন যে, তুমি তোমার অভিযোগ তুলে নাও, আমি তোমার বিরুদ্ধে মামলা উঠিয়ে নেব।”
বাত্রা বিচিত্রার বিশেষ অনুসন্ধানে জানা যায় যে, আজিমপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের প্যাডের ১৭৪ নং পাতায়, স্মারক নং- ১৯৫২, তারিখ- ০৫/০৬/২০২২ খ্রিষ্টাব্দে লিখিত এবং মো. ইলিয়াস আহমেদ কর্তৃক স্বাক্ষরিত পল্টু দাসের বিরুদ্ধে লালবাগ থানায় একটি সাধারন ডায়েরী গত ০৯/০৬/২০২২ খ্রিঃ তারিখে নথিভুক্ত করা হয়। যার সাধারন ডায়েরী নং- ৪৪১। সেখানে সংশ্লিষ্ট বক্তব্যের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘উল্লেখিত ঠিকাদার পল্টন দাস ওরফে পল্টু বিভিন্ন সময়ে পত্রের মাধ্যমে, ভুয়া সাংবাদিকদের ব্যবহার করে অনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে অসম্পাদিত প্রায় ২.০০ লক্ষ টাকাসহ বিপুল পরিমানের চাঁদা দাবী করে আসছেন। এই চাঁদা পাওয়ার ক্ষেত্রে তিনি সর্বদা কিছু ভুয়া/ হলুদ সাংবাদিকদের ব্যবহার করে আসছেন।’ অনুসন্ধানে আরও জানা যায় যে, পল্টুর বিরুদ্ধে জুন মাসের ৯ তরিখে সাধারন ডায়েরী নথিভুক্ত হওয়ার ২২ দিনের মাথায় সংশ্লিষ্ট বিষয়ে একই থানায় তার বিরুদ্ধে পেনাল কোড ১৮৬০ অনুযায়ী ৩৮৫/৫০৬ ধারায় একটি চাঁদাবাজির মামলাও রুজু করা হয়। যার মামলা নং- ০৩, তারিখ ০১/০৭/২০২২ খ্রিঃ। এই মামলাটির বাদী হয়েছেন আজিমপুর গণপূর্তের এসও. আব্দুল্লাহ আল মামুন। পল্টুর বিরুদ্ধে সাধারন ডায়েরীতে দাবীকৃত চাঁদার টাকা ‘বিপুল পরিমানে’ উল্লেখ করা হলেও মামলায় তিনি ‘৫০ লক্ষ’ টাকা চাঁদা দাবীর কথা নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করেছেন। চলমান এই চাঁদাবাজি মামলার আসামী পল্টন দাস ওরফে পল্টু বর্তমানে জামিনে রয়েছেন বলে মামলা সূত্রে জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কথা বলতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী ইলিয়াস আহমেদের মুঠোফোনের দুটি নম্বরই বন্ধ পাওয়া যায়। সংক্ষেপিত কথা হয় উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী এমদাদ হোসেনের সাথে। মামলাটির বাদী আব্দুল্লাহ আল মামুনের সাথেও কথা বলার চেষ্টা করা হয়। ইলিয়াসের বিরুদ্ধে পল্টুর দুর্নীতির অভিযোগ, বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন, পল্টুর বিরুদ্ধে চাঁদবাজি বিষয়ে থানায় সাধারন ডায়েরী নথিভুক্ত করা, অতঃপর আরেক প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মামুন বাদী হয়ে একই থানায় চাঁদাবাজি মামলা দায়ের ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বার্তা বিচিত্রার কাছে আরও যা তথ্য রয়েছে, তা “মুজিববর্ষে গণপূর্তের ঠিকাদার পল্টুর জীবনে হরিষে বিষাদ” শিরোনামে পাঠকদের জন্য পরের পর্বে প্রকাশিত হবে।