মো:নূর আলম,দূর্গাপুর(নেত্রকোনা)প্রতিনিধিঃ
আমরা বাঙালি। আমাদের প্রাণের ভাষা বাংলা। বাংলা আমাদের অস্তিত্ব,শেকড়ের প্রগাঢ় ধ্বনি। প্রতিমুহূর্তে অনুভূতির চূড়ান্ত মাত্রা।
১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ রেসকোর্স ময়দানের নাগরিক সংবর্ধনা সভায় এবং ২৪ মার্চ কার্জন হলে বিশেষ সমাবর্তনের ছাত্রসভায় বেশ জোরালো ভাষায় বলেন, পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। যারা এর বিরোধিতা করে, তারা পাকিস্তানের দুশমন। তাদের কঠোর হাতে দমন করা হবে।
পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র জনতা এটা কোনভাবেই মানতে পারেনি। পরবর্তীতে
ক্ষুব্ধ বাঙালি প্রাণের ভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সোচ্চার হতে থাকে। শুরু হয় ভাষা আন্দোলন। দিনে দিনে এ দাবি তীব্র হতে থাকে।
১৯৫২ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা জেলার সর্বত্র এক মাসের জন্য হরতাল-সভা-সমাবেশ-মিছিল নিষিদ্ধ করে জেলা প্রশাসন। জারি করা হয় ১৪৪ ধারা।
২১শে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে ছাত্র জনতা মিছিল করলে তাদের উপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করা হয়। সেই গুলিতে শহীদ হন সালাম,বরকত,রফিক,জব্বার সহ অনেকে। মায়ের ভাষার জন্য তাদের এই আত্মত্যাগের বীরত্বগাঁথার কথা ছড়িয়ে যায় সারা বাংলায়।
তাদের স্মরণে নির্মিত হয় শহীদ মিনার।
ভাষা শহীদদের প্রতি সম্মান জানিয়ে নেত্রকোনার দুর্গাপুরেও পরবর্তীতে স্থাপন করা হয় শহীদ মিনার। এটি স্থাপনকালে অনেক ঘটনা রচিত হয়ে যায়। সেই সময় দুর্গাপুরের এম.কে.সি. এম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র আবুল বাশারের আহ্বানে একটি সভা হয়। সভায় সকল শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে সিদ্ধান্ত হয় তারাও একটি শহীদ মিনার তৈরি করবে। এই শহীদ মিনার তৈরি করতে টাকার প্রয়োজন।
ছাত্ররা একত্রিত হয়ে আবুল বাশারকে বলে আমরা ৫০ পয়সা করে আপনার হাতে দিব, বাকি কাজ আপনার।
১৯৬৭ সাল। ফেব্রুয়ারি মাস। কদিন পরেই শহীদ দিবস। তার আগেই শহীদ মিনার তৈরি করতে হবে। এ নিয়ে ছাত্রদের মাঝে খুব উত্তেজনা। বিল্লাল, দিলদার,মোহন, লুৎফর, কাজল, দেবেশ, জীবেশ, দেবল, খালেক বারী সহ সকলেই মিস্ত্রি শংকরের কাছে গিয়ে বলে, দাদা আমরা সকল ছাত্র মিলে ৬৫ টাকা সংগ্রহ করতে পেরেছি। এই টাকা দিয়ে আমাদের স্কুলে একটি শহীদ মিনার তৈরি করে দিতে হবে। এতে শংকর মিস্ত্রি রাজি হয় এবং কাজে লেগে যায়।
একদিনে তিনি শহীদ মিনারটি তৈরি করে দেন। সকল ছাত্রবৃন্দ আনন্দিত হয়। তারা পরদিন সকালে পানি দেওয়ার জন্য স্কুলে গিয়ে দেখে প্রাণের শহীদ মিনারটি কে বা কারা ভেঙে ফেলেছে।
খবরটি আবুল বাশারের কাছে গেলে তিনি দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন এবং তিনি বুঝতে পারেন কারা এই শহীদ মিনার ভেঙেছে। কিন্তু তিনি তাদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নিতে পারলেন না। কারণ তারা পাকিস্তান সরকারের দালাল,তাদের অনেক শক্তি।
আবুল বাশার মনে মনে ভাবলেন,বাঙালি দমে যাবার পাত্র নয়। তিনি তার শখের হারকুলিস বাই সাইকেলটি ৪৫ টাকায় বিক্রি করে শংকর মিস্ত্রিকে অনুরোধ করে বললেন, দাদা আমি টাকা দিচ্ছি আপনি আবার শহীদ মিনার তৈরি করে দেন। আর ভয় পাবেন না, আমরা আছি। অতঃপর তৈরি হলো গৌরবের সেই শহীদ মিনার। পরদিন অমর একুশে ফেব্রুয়ারি। শহীদ বেদীতে পুষ্পমাল্য অর্পণ করে ভাষা শহীদদের প্রতি সম্মান নিবেদন করলেন তারা। এরপর ‘শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দেবোনা’ স্লোগানে এম. কে.সি. এম স্কুল প্রাঙ্গণ মুখরিত করে তুলে ছাত্ররা। এসময়
জুনিয়র ছাত্ররা আগে,সিনিয়ররা পিছে এভাবে লাইন করে দুর্গাপুর বাজারে এক র্যালী করা হয়।
এরপর থেকে দুর্গাপুরবাসী প্রতিবছর শহীদ দিবসে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে আসছে। যেটি সূচনা হয় ১৯৬৭ সালে। যার নেপথ্য নায়ক কবি আবুল বাশার।