আব্দুল্লাহ আল মামুন (ঢাকা ব্যুরো প্রধান): একজন গঠনমূলক, সৃষ্টিশীল ও সংবেদনশীল মনুষ হিসেবে দিনদিন আপন মহিমায় আলোকিত হয়ে উঠেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ। ২০২১ সালের ২৯ মার্চ উপাচার্যের দায়িত্বভার গ্রহনের পর বিগত ২ বৎসরে রোগীবান্ধব বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়কে এক অনন্য আসনে নিয়ে গেছেন। দায়িত্বভার গ্রহনকালে মানবতার ফেরিওয়ালা অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, “বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে আমি এখানে কাজ করছি। মেডিকেল শিক্ষাকে সর্বোচ্চ শিখরে নেয়ার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সহায়তার পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে আমার প্রচেষ্টা অব্যহত থাকবে। দেশের বাইরে যাতে রোগী না যায় এবং এখানকার ছাত্ররা যেন সর্বোচ্চ শিক্ষা পায় এ ব্যাপারে ভূমিকা নেব। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার মান উন্নত করার পদক্ষেপ নেয়া হবে।” উপাচার্যের দায়িত্বভার গ্রহনের নির্ধারিত ৩ বছর হতে ইতোমধ্যে ২ বছরের কিছু বেশী সময় পার হয়ে গেলেও অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ নিজের প্রতিশ্রুত পথেই সফলতার সাথে হেঁটে চলেছেন।
তাঁর এই সময়ের মধ্যেই বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব কোভিড ফিল্ড হাসপাতালের শুভ উদ্ভোধন করা হয়। করোনার সময় বেতার ভবনে ১০০ শয্যার করোনা ইউনিট চালু করা হয়। আইসিইউ ও কেবিন সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয় এবং লক্ষ লক্ষ মানুষকে করোনা ভ্যাক্সিন দেওয়া হয়। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিকক্ষ কেবিন-১১৭ উদ্ভোধন করা হয়। এই কক্ষেই কবি শেষ নিঃস্বাস ত্যাগ করেন। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ছাত্র-শিক্ষক মিলন কেন্দ্রটি চালু করা হয়। ২০ হাজার লিটার ধারন ক্ষমতাসম্পন্ন অক্সিজেন প্ল্যান্ট উদ্বোধন করা হয়। রোগীদের সুবিধার্থে বৈকালিক স্পেশালাইজড আউটডোর চালু করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ২৩ বছর পর প্রথমবারের মতো হেলথ কার্ড চালু করা হয়। সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে সাধারন জরুরী বিভাগের শুভ উদ্বোধন করা হয়। প্রবীণদের পুষ্টিসহ ৩ টি গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। শিশু সার্জারি বিভাগে স্কিল ল্যাব, ডিজিটাল লাইব্রেরী ও ৩ টি ডিভিশন এবং হিজড়া নামে পরিচিত তৃতীয় লিঙ্গের শিশুদের চিকিৎসার জন্য ডিসঅর্ডার অফ সেক্স ডেভেলপমেন্ট বহির্বিভাগ ক্লিনিক উদ্বোধন করা হয়। ৯০০ কর্মচারীদের ঝুলে থাকা চাকুরী স্থায়ীকরণ করা হয় এবং ৭০০ নতুন নার্স নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়, ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয় ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালযের সাথে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশের প্রথমবারের মতো গর্ভাবস্থায় ভ্রুণের ত্রুটির ঝুঁকি নির্ণয় পরীক্ষা চালু করা হয়। ৭৮ জন শিক্ষক ও চিকিৎসকদের মাঝে গবেষণা অনুদান প্রদান করা হয়েছে। নতুন বাজেটে ২০২২-২০২৩ অর্থ বছরে গবেষণা খাতে বরাদ্দ ৪ কোটি টাকা থেকে ২২ কোটি ৪০ লক্ষ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। বুক না কেটে, অজ্ঞাণ না করে প্রথমবারের মতো অ্যাওরটিক ভালভ সফলভাবে প্রতিস্থাপন করা হয়। বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো কাটা ছেঁড়া ছাড়া রক্তনালীর আঁকাবাঁকা শিরা (ভেরিকোস ভেইন) চিকিৎসায় অত্যাধুনিক আরএফএ মেশিন এর উদ্বোধন করা হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের শুভ উদ্বোধন করেন। ইতোমধ্যে সুপার স্পেশালাইজড ১৪ টি বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ (অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপকবৃন্দ) বহির্বিভাগে রোগী দেখা শুরু করেছেন।
এছাড়াও এই সময়ের মধ্যে রোগীবান্ধব বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ তাঁর অর্জনের ঝুলিকে বেশ বর্ণিল করতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর এ সমস্ত অবদানের সুফল ভোগ করছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জটিল ও কঠিন রোগের চিকিৎসা নিতে আসা রোগী, মেডিকেলের ছাত্র-শিক্ষক, চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্ট সকলেই।
শারফুদ্দিন আহমেদ গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার খায়েরহাট গ্রামে ১৯৫৬ সালের ৭ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। তারা বাবা শামসুদ্দিন আহমেদ এবং মা হোসনে আরা বেগম। তিনি গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী জি. সি. পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৭২ সালে এসএসসি এবং ফরিদপুরের সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ থেকে ১৯৭৪ সালে এইচএসসি পাস করেন। তিনি বরিশালে অবস্থিত শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) থেকে ১৯৮২ সালে এমবিবিএস ডিগ্রি লাভ করেন। তৎকালীন ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্রাজুয়েট মেডিসিন এন্ড রিসার্চ (বর্তমানে বিএসএমএমইউ) থেকে ১৯৮৫ সালে অফথালমোলজিতে ডিপ্লোমা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০৪ সালে একই বিষয়ে এমএস ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।
ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ ১৯৮২ সালে সহকারী সার্জন হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন। তিনি দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে মেডিকেল অফিসার, রেসিডেন্ট সার্জন ও রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ১৯৯১ সালে সহকারী অধ্যাপক (চক্ষু) হন এবং ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত একই পদে নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৯৮ সালের ২৪ শে মার্চ তিনি তৎকালীন ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্রাজুয়েট মেডিসিন এন্ড রিসার্চ (আইপিজিএমআর) এ সহকারী অধ্যাপক (চক্ষু) হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৯৮ সালের ৩০ এপ্রিল আইপিজিএমআর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হয়। তিনি ২০০১ সালে বিএসএমএমইউ এর চক্ষু বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও ২০০৯ সালে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি লাভ করেন। ২০০৯ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত তিনি বিভাগটির সভাপতি ছিলেন। বিএসএমএমইউ-তে কমিউনিটি অফথালমোলজি বিভাগ চালু হলে তিনি নবপ্রতিষ্ঠিত বিভাগটির অধ্যাপক ও সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
অধ্যাপনা ও চিকিৎসা সেবা প্রদানের পাশাপাশি ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বিএসএমএমইউ এর সিন্ডিকেট ও একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্য, প্রিভেনটিভ এন্ড স প্রিভেনটিভ এন্ড সোশ্যাল মেডিসিন অনুষদের ডিন এবং উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন।
আগামী দিনগুলোতে বঙ্গবন্ধু রিসার্চ সেন্টার স্থাপন, অফিসিয়াল কাজে আরো গতি আনার জন্য ই-ফাইলিং চালু করা এবং ডাবল সিফটে ওটি কার্যক্রম চালু করাসহ রোগী সেবায় বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করার স্বপ্ন দেখেন এই রোগীবান্ধব ও মানবিক ডাক্তার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ।