বার্তা রিপোর্টঃ এনামুল হক
ঢাকার বাংলাবাজারে বইয়ের দোকানে কাজ করতেন মওলানা রায়হানুর রহমান। মাস শেষে বেতন পেতেন মাত্র আড়াই হাজার টাকা। তখন থেকেই উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন বুনেন মনে। একদিন শুরুও করে দিলেন- অনেকটা শূন্য হাতেই। পথচলার কয়েক বছরের মাথায় আজ তিনি সফল উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। বর্তমানে তানযিম কুতুবখানা, কটন পার্ক, বুক পার্ক, আলতাফ অয়েল মিল ও হালাল ফুডসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী তিনি। নরসিংদী শহরে আলেম উদ্যোক্তা হিসেবে নাম পড়েছে। অনেকটা আলেম ব্যবসায়ীদের মডেল হয়ে উঠেছেন মাওলানা রায়হান
একজন রায়হানুর রহমান
মওলানা রায়হানুর রহমানের জন্ম ১৯৮৮ সালে। নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার বেগমাবাদে। শিক্ষার হাতেখড়ি গ্রামের মক্তবে। ২০০৫ সালে নরসিংদীর দারুল উলুম দত্তপাড়া মাদ্রাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স) করেন। বাবা হাজি আলতাফ ছিলেন ব্যবসায়ী। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাবার ব্যবসা পড়ে যায়। বাবার রোজগারে কোনো রকমে সংসার চলত। পড়ার সময়ে তেমন হাতখরচ পেতেন না রায়হান। কাজ করতে হতো। জালালাইন (উচ্চ মাধ্যমিক) পড়াকালে টুকটাক ব্যবসা ধরেছিলেন। সে বছর নরসিংদীতে তানযিমের সম্মেলনে বই, আতর, টুপি, তসবি এবং ইসলামি ওয়াজ ও সংগীতের ক্যাসেট বিক্রি করেন। ভালোই লাভ হয়েছিল সেবার।
বইয়ের দোকানে কাজ
দাওরায়ে হাদিস শেষে বাংলাবাজার মাকতাবাতুল আশরাফে কাজ নেন। বেতন দুই হাজার ৫০০ টাকা। বড় বোনের বাসায় থাকতেন। সেখান থেকে যাতায়াত করে মাস শেষে তেমন কিছুই থাকত না হাতে। এভাবে তিন মাস পর বেতন বাড়ে এক হাজার। একদিন প্রমোশনও হয়। দায়িত্ব পান মার্কেটিং পদে। ‘শুরুর দিনগুলোই দুপুরে কোনো দিন খেয়েছি কি না মনে করতে পারছি না। জানতাম, দুপুরে খেলে মাস শেষে ধার করতে হবে। খাওয়ার সময় হলে অফিস থেকে বের হয়ে এদিক-সেদিক হেঁটে আসতাম। সহকর্মীরা ভাবত, খেয়ে এসেছি।’ বললেন রায়হান।
যেভাবে ব্যবসা শুরু
তখন ২০০৭ সালের জুলাই মাস। কোম্পানির লাইব্রেরি ভিজিটে নরসিংদী আসেন। তানযিমুল মাদারিসিল কওমিয়ার প্রতিষ্ঠিত লাইব্রেরি বৌয়াকুড় মোড়ের তানযিম কুতুবখানায় গিয়ে জানতে পারেন, তারা লাইব্রেরিটা ছেড়ে দেবেন। লাইব্রেরিতে চার লাখ ৯৮ হাজার টাকার বই ছিল তখন। সিজনে সেল করে টাকা পরিশোধ করার চুক্তিতে বাকিতে দোকান নেন রায়হানুর রহমান।
পরিচিতদের থেকে ধার নিয়ে ব্যবসা গোছাতে থাকেন রায়হান। শায়খুল হাদিস মওলানা বশির উদ্দীন, মওলানা শওকত হোসাইন সরকার, মওলানা ইসমাইল নুরপুরী, মুফতি রশিদ আহমদ ও মওলানা আব্দুন নুর তাকে বিশেষভাবে সহযোগিতা করেন। এগিয়ে আসেন ভাগিনা আলী আজমও। ‘ব্যবসায় বাবার থেকে এক টাকাও আনিনি। শূন্য হাতেই শুরু করেছিলাম। ভাড়া ও অ্যাডভান্স দেওয়ার মতো টাকা ছিল না। সেই টাকাটা দিয়েছিলেন মওলানা আব্দুন নুর সাহেব।’ বললেন রায়হানুর রহমান।
কটন পার্ক ও জীবন বদলের গল্প
রাহয়ানের তানযিম কুতুবখানা থেকে পুরো নরসিংদী জেলায় বই যায়। কওমি মাদ্রাসার বই বিক্রির পাশাপাশি আলিয়া মাদ্রাসার বই বিক্রি শুরু করেন। আলিয়া মাদ্রাসার বই প্রকাশ করে, এমন কয়েকটি প্রকাশনীর জেলার এজেন্ট হন। ২০০৯ সালে স্টেশনারিসামগ্রী, মোবাইল, ফ্লেক্সিলোড ও কম্পোজ-ফটোকপির ব্যবসা দেন। ২০১১-১৩ সালে যখন সরকার স্কুল ও আলিয়া মাদ্রাসায় গ্রামার-ব্যাকরণ বিনামূল্যে দিতে শুরু করেন, তখন লাইব্রেরি ব্যবসায় ধস নামে। অসুবিধায় পড়ে যান রায়হান। সে সময় ইনডেক্স প্লাজার সঙ্গে কাপড়ের শোরুম দেন- কটন পার্ক। সেখানে সব ধরনের রেডিমেট জেন্স আইটেম বিক্রি করতেন। আট হাজার টাকার পাঞ্জাবি থেকে শুরু করে ৫০০ টাকায়ও কাপড় পাওয়া যায় সেখানে। অল্প দিনে কটন পার্ক বেশ নাম করে। মানুষের মুখে রায়হানের নাম পড়ে। নরসিংদীর আলেমরা বলেন, ‘আলেমদের মধ্যে সেরা ব্যবসায়ী হলেন রায়হান। তার কাছ থেকে আমাদের শেখার আছে।’
এবার উদ্যোক্তা হলেন
করোনার সময় কাপড় ও লাইব্রেরির ব্যবসায় মন্দা দেখা দেয়। প্রতি মাসে দোকান ও গোডাউন ভাড়া, কর্মচারীর বেতন, মা-বাবার ওষুধ ও পরিবারের খরচ- সব মিলিয়ে হতাশার মধ্যে পড়ে যান রায়হান। অনেক ভেবে-চিন্তে ফুড আইটেমের ব্যবসা শুরু করেন। সরিষার তেল তৈরির কারখানা খুলেন। নাম রাখেন- হাজি আলতাফ অয়েল মিল। প্রতিদিন সেখানে ৫০-৬০ মণ সরিষা ভাঙানো হয়। হালাল ফুডের অধীনে বিক্রি করতে থাকেন মধু, ঘি, রসুনের আচার ও মসলাপাতি। ‘এই ফুড আইটেমগুলো আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। আমাকে সচ্ছলতা ফিরিয়ে দিয়েছে। লকডাউনে এক দিনও বাসায় বসে থেকেছি বলে মনে হয় না। জানতাম, বাসায় বসে থাকলে হবে না। আমাকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। সে সময় কওমি উদ্যোক্তার রোকন রাইয়ান ও এমদাদ আমাকে যথেষ্ট সাপোর্ট দিয়েছেন।’ বললেন রায়হানুর রহমান। উদ্যোক্তা রায়হানের অধীনে অনেকে এখন চাকরি করেন। সব প্রতিষ্ঠান মিলে প্রতি মাসে সেল আছে প্রায় অর্ধ কোটি টাকা। আড়াই তিন লাখ টাকা মুনাফা আসে মাস ঘুরলেই।
রায়হানের স্বপ্ন
রায়হানের এখন সুদিন ফিরেছে। স্বপ্ন দেখছেন, সারা দেশে ‘ই-তারা’ নামে ই-কমার্স ব্যবসা শুরু করবেন। সেটির কাজও চলছে। বললেন, ‘তরুণদের বলব, নিজে উৎপাদন করুন। উদ্যোক্তা হন। রিসেলার হলে হয়তো কমিশন পাবেন, কিন্তু বড় কিছু করতে পারবেন না।’