এস আই খান:
নরসিংদীর বেলাবতে ইতালির দালালের ফাদে পরে বিপাকে একাধিক লোক, দালালের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থার দাবী দাবী জানিয়েছেন মোঃ জুনায়েত হোসেন খান, তাজুল ইসলাম ও রাসেক রাব্বানী নামে ৩ ভূক্তভোগী।
উপজেলার চর বেলাব গ্রামের ওমরাও খান মাস্টারের ছেলে মো: জুনায়েত হোসেন খান বলেন, ইতালির দালাল আব্দুল আওয়াল মাস্টার (সুরুজ মাস্টার) পিতা: মৃত আশ্রব আলী, গ্রাম: টান লক্ষীপুর, পো: দুলালকান্দি, থানা: বেলাব, জেলা: নরসিংদী আমার বাবার সহকর্মী। তিনি আমার বাবার সাথে চর লক্ষীপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘদিন কর্মরত ছিলেন। সেই সুবাধে তার পরিবারের সাথে আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক বৃদ্ধি পায়। ২০০৫ সালে প্রথমে বাবার কাছ থেকে হাওলাত বাবদ ৫ লাখ টাকা ধার নেয়। কিন্তু কিছুদিন যাবার পরই আমাকে ইতালি নেবার কথা বললে বাবা আপত্তি জানান। তারপরও আমাকে ও আমার পরিবারের বাকী সদস্যদের কে মাসিক ৩ লাখ টাকা ইনকামের প্রলোভন দেখিয়ে স্পন্সরের মাধ্যমে ইতালি পাঠাবে বলে পরিবারের সদস্যদের রাজি করান। তিনি বলেন, স্পন্সরে ইতালি যেতে হলে মোট ১১ লাখ টাকা খরচ হবে। তাই বাবার কাছ থেকে আরোও ৬ লাখ নেয়। কিন্তু আমার পাসপোর্টসহ সকল কাগজপত্র যোগাড় করে দেবার পর তিনি নানান তালবাহানা শুরু করেন। উনার ছেলে নজরুল ইসলাম আমাকে প্রায় ৪, ৫ বার ইতালি এম্বাসীতে আবেদন করান কিন্তু এতেও কোনো রকম সুযোগ হয়নি। প্রতিবার আবেদনের সময় আমার কাছ থেকে কখনও ৫০ হাজার আবার কখনও ১ লাখ ৫০ লাখ টাকা নেন। এর ভিতরে আমি সরকারী চাকুরীর জন্য বিভিন্ন দপ্তরে চাকরীর জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকলে তিনি বাধা দেন। বলেন যে কোনো ভাবে আমাকে ইতালি নিয়ে যাবেন। ২৬/০৭/২০১২ সালে ভৈরব উপজেলা পরিষদে কম্পিউটার অপারেটর পদে চাকরী দেবার কথা বলে সে ও তার ছোট ছেলে উজ্জল ইসলামের বউ রুপা আক্তারের মাধ্যমে চাকরীর জন্য ৪ লাখ টাকা নেয়। কিন্তু সেখানেও আমার চাকরী না হওয়ায় অনেক দরবার করে কয়েক কিস্তিতে ৪ লাখ টাকা ফেরত আনা হলেও ইতালির উদ্দ্যেশ্যে প্রদানকৃত ১১ লাখ টাকা ও এম্বাসীতে দেওয়া ২ লাখ টাকা সহ মোট ১৩ লাখ ফেরত দেয়নি। সর্বশেষ ২০১৮ সালের জানুয়ারী মাসের ২৬ তারিখে বিআরটিএতে চাকুরীর বব্যস্থা হলে তার কাছে আমাদের পাওনা ১৩ লাখ টাকার মধ্যে মাত্র ৫ লাখ টাকা ফেরত দেবার জন্য বিশেষভাবে তার হাতে পায়ে ধরে অনুরোধ করা হলেও সে তার ছেলে নজরুলের কথা বলে অজুহাত দেখাতে থাকে। নিরুপায় হয়ে এলাকার কয়েকজনের সাথে বিষয়টি শেয়ার করলে তারা দায়িত্ব নিয়ে আমাকে ৩ লাখ টাকা উদ্ধার করে দেয়। আরও ১০ লাখ টাকা তার কাছে আমার পাওনা রয়ে যায়। এরই মধ্যে বাবার ক্যান্সার ধরা পরলে তার কাছে টাকার জন্য বার বার যাওয়া হলেও কোনো সুরাহা আসেনি। এ কষ্ট নিয়ে প্রায় চিকিৎসার অভাবে ২০২৩ সালে বাবা মারা যায়। তিনি আরও সরকার ও প্রশাসনের কাছে আমার আকুল আবেদন আওয়াল মাস্টারের মত আমাদের এলাকায় আরও অনেক দালাল রয়েছে যাদের কাছে আমার মত শত শত বালকের ভবিষ্যৎ ধ্বংস হচ্ছে। কিন্তু এসব লেনদেনের কোনো প্রমানপত্র না থাকায় তারাও ধরা ছোয়ার বাইরে থাকে।
কিছুদিন আগে অবৈধভাবে ইতালি যাবার পথে বেলাব উপজেলা ১৪ জন বালক সাগরে ডুবে মারা গেলে আওয়াল মাস্টার, নজরুল ইসলাম, আলম, জাকিরের মত দালালদের তথ্য প্রকাশ পায়।
আরেক ভূক্তভোগী মোঃ রাসেক রাব্বানী বলেন, উপজেলার টান লক্ষীপুরের নজরুল ইসলাম ও তার বাবা মোঃ সুরুজ মাস্টার ইতালি নিয়ে যাওয়ার কথা বলে আমার কাছ থেকে ১৫ লাখ টাকা নেয়। পরে আমাকে ভূয়া ভিসা দিয়ে ইতালি নিয়ে যায়। ৫ মাস কোন কাজ পাইনি, চিকিৎসা পাইনি,খাবার পাইনি।পরে দেশ থেকে৫/৬ টাকা নিয়ে সেখানে খাওয়া দাওয়া, চিকিৎসা ও বাসা ভাড়া দেই। ইতালি যাওয়ার জন্য উপজেলার বেলাব রুটে দিয়া ট্রাইলস স্যানিটারি দোকান বিক্রি করে দেই।আজ আমি রাস্তার ফকির। আমাকে ঐনি (দালাল) বলছে তুমি ইতালি গেলে ৩ লাখ টাকা বেতন পাইবা। কিন্তু আমাকে ভূয়া ভিসা দিয়ে ইতালি নিয়ে যায়। সেখান থেকে মানবেতর জিবনযাপন করে দেশে ফিরে আসি। আমি এখন ব্যবসা বানিজ্য হারিয়ে পথের ফকির। পরিবারের লোকজনও আমার সাথে ভালভাবে আচরণ করে না।
চর বেলাব গ্রামের হাজ্বী মোঃ মোসলে উদ্দিনের ছেলে মোঃ তাজুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ দিন দোবাইতে ছিলাম।ঐখানে থাকা অবস্থায় সুরুজ মাস্টার ও তার ছেলে নজরুল ইসলামের সাথে ইতালি যাওয়ার জন্য কথা হয়।পরে দোবাই থেকে দেশে এসে ইতালি যাওয়ার জন্য সারে ১১ লাখ টাকা দেই।টাকা দেওয়ার দেড় বছর পরে আমাকে বলে সে(দালাল) আমাকে ইতালি নিয়ে যেতে পারবে না। এখন আমি দোবাইতে ও যায়তে পারিনি, ইতালিতে ও যাইতে পারিনি। সরকারের কাছে আমি এদের বিচার দাবি করছি।
তাছাড়াও আওয়াল মাস্টার উপজেলার আমলাব ইউনিয়নের কান্দুয়া গ্রামের মো: শহিদুল্লাহ ভূইয়ার ছেলে মো: কাইয়ুম ভূইয়ার কাছ থেকে ইতালি নেওয়ার কথা বলে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ও পাসপোর্ট নেয়। কিন্তু ২ বছর হয়ে যাচ্ছে এখনও কোনো ব্যবস্থা হয়নি। এখন টাকা ও পাসপোর্ট ফেরত চাইলে নানান অজুহাত দেখায়।
এছাড়া লক্ষীপুর গ্রামের আলকাছ মিয়ার ছেলে নাঈম, বিল্লাল হোসেন, পন্ডিত মিয়া, দুলালকান্দী গ্রামের হাসিমের ছেলে শহিদুল সহ আরও অনেকেই এ সকল দালাল দ্বারা প্রতারিত হয়েছে।
বেলাব ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোহাম্মদ আলী সাফি বলেন সরকার ও প্রশাসনের কাছে আমার আকুল আবেদন এসকল দালালদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করে সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষা করতে সচেষ্ট হবেন।
উপজেলার নারায়নপুর ইউপি চেয়ারম্যান কাউসার কাজল বলেন, এ বিষয়ে অনেক অভিযোগ আমাদের কাছে এসেছে। এ সকল দালালদের মধ্যে নজরুল ইসলাম, সুরুজ মাস্টার (আওয়াল মাস্টার), আলম ও জাকিরের নাম সবচেয়ে বেশি শুনা যায়। তবে সুরুজ মাস্টারের বিরুদ্ধে চর বেলাব গ্রামের রাসেক রব্বানী লিখিত অভিযোগ করলে সুরুজ মাস্টারকে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে পর পর ৩ বার নোটিশ করা হয় কিন্তু তিনি কোনো নোটিশের জবাব দেন নাই। কিন্তু এসকল দালালদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা না হওয়াই তারা সবসময় ধরাছোয়ার বাইরে থাকে। তাই প্রশাসনকে অনুরোধ করবো অবৈধ পথে বিদেশগমন রোধের জন্য এ সকল দালালদের সনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য।
এ অভিযোগের বিষয়ে আওয়াল মাস্টার (সুরুজ মাস্টার) বলেন, আমি ইতালিতে কোনো লোক পাঠাই না। যারা অভিযোগ করেছে মিথ্যা বলেছে। তবে আমার ছেলে ইতালি থাকে সেখান থেকে সে লোক নেওয়ার ব্যবস্থা করে। এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।