মোঃ বশির আহমেদ সানি
ঢাকা ওয়াসার জোন-১ এ দীর্ঘদিন ধরে চলা দুর্নীতির অনুসন্ধানে নেমে যেন “কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ” বেরিয়ে এসেছে। প্রায় ৫০ কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্য এবং অন্তত ৩ কোটি টাকার সাইড বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সাংবাদিকদের ওপর মাফিয়া স্টাইলে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ইতোমধ্যে হুমকির বিষয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে, থামবে না ‘বার্তা বিচিত্রা’র অনুসন্ধান।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই হুমকির পেছনে রয়েছে হাজার কোটি টাকার অবৈধ সাম্রাজ্য হারানোর ভয়। সিবিএ’র কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে ওয়াসার গুরুত্বপূর্ণ জোন-১ নিয়ন্ত্রণ করে আসছে।
নিয়োগ বাণিজ্যে কোটি টাকার লেনদেন
অভিযোগ রয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তড়িঘড়ি করে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া ২,৫৯৪ জনের মধ্যে প্রায় ৫০০ জনই নিয়োগ পেয়েছেন সিন্ডিকেটের সরাসরি সুপারিশে। এই নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমেই প্রায় ৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।
ভিআইপি এলাকা মতিঝিলেও সিন্ডিকেটের দাপট
ঢাকা ওয়াসার সবচেয়ে ভিআইপি ও লাভজনক এলাকা মতিঝিল জোনে। এই বিশাল রাজস্বের এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ করছেন জোন-১ এর শফিফুল ইসলাম পাটোয়ারী সিবিএ’র কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি, সাংবাদিককে হুমকি দেওয়া মাস্টারমাইন্ড মনির হোসেন পাটোয়ারীর ভাই।
ডুপ্লি’ বাণিজ্যে কোটি টাকার খেলা
লুটপাটের এখানেই শেষ নয়; জোন-১ এ চলছে ‘ডুপ্লি’ বাণিজ্য। সিবিএ’র ক্ষমতার অপব্যবহার করে আব্দুল মান্নান, মোঃ ইকবাল আহমেদ ও মোঃ আলতাফ হোসেন প্রত্যেকেই দুটি করে সাইট অবৈধভাবে দখল ডুপ্লির মাধ্যমে পরিচালনা করে। বার্তা বিচিত্রা অনুসন্ধানী টিমেকে ইকবাল আহমেদ জানান," আমার সাইট আমি বেশিরভাগ পরিচালনা করি নিজে, বাকি সময় দেখার মত কেউ নাই।" ডুপ্লি মিরানের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন,"মিলন তো এমনিই আমার কাছে আসতো, দেলোয়ারের লোক ছিল ওইখান থেকে পরিচয় মাঝে মধ্যে আমার কাছে আসে। কিন্তু আমি তারে না করে দিছি।"
অফিস সহকারীই হয়ে উঠেছেন রাজস্ব পরিদর্শক!
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো—যাদের দায়িত্ব কেবল অফিস সহায়তা দেওয়া, মাসোহারার বিনিময়ে তাদের দিয়েই করানো হচ্ছে রাজস্ব আদায়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ। নুরুজ্জামান আকন্দ নামের এক অফিস সহকারী কার্যত রাজস্ব পরিদর্শকের দায়িত্ব পালন করছেন। কীভাবে সম্ভব এই ম্যাজিক? একজন অফিস সহকারী রাজস্ব আদায় করতে পারে কিনা এ বিষয়ে নুরুজ্জামান আকন্দকে মুঠোফোনে জিজ্ঞেস করলে বার্তা বিচিত্রার অনুসন্ধানী টিমকে বলেন,"এই প্রশ্নটা আমার কর্তৃপক্ষকে জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারবেন পারে কিনা! কর্তৃপক্ষ কে? জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, "আমার জোনাল প্রদান আছে।"তার শিক্ষাগত যোগ্যতা জানতে চাইলে তিনি ব্যক্তিগত প্রশ্নের উত্তর দিতে রাজি নয় বলে জানান। এরপর তিনি বলেন,"অফিস সহকারী এরকম ঢাকা ওয়াসায় মনে করেন আরো বহুত আছে সব জায়গায় এরকমই দায়িত্ব দিয়ে রাখছে, আমারে তো আর একা দেয় নাই।"
শুধু নুরুজ্জামানই নন; অফিস সহকারী কাম ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মোঃ আনোয়ার, আহসানুল্লাহ এবং আব্দুল হান্নানকে দিয়েও রাজস্ব পরিদর্শকের দায়িত্ব পালন করানো হচ্ছে। আরও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, নারী কর্মী কুলসুম বানুর নাম ব্যবহার করে একটি সাইট বরাদ্দ নিয়ে সেটি ‘ডুপ্লি’ পদ্ধতিতে পরিচালনা করছেন স্বয়ং শফিফুল ইসলাম পাটোয়ারী।
কর্তৃপক্ষের রহস্যজনক নীরবতা
জোন-১ এর দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বিষয়গুলোকে “জটিল প্রক্রিয়া” বলে এড়িয়ে যাচ্ছেন। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে জোন-১ এর প্রধান রফিকুল ইসলাম বার্তা বিচিত্রাকে জানান, "আমি এখনো এখানে গুছিয়ে উঠতে পারি নাই আর বিষয়টা এখানে অনেক জটিল প্রক্রিয়া। এখানে কেউ থাকছে ৮ মাস কেউ থাকছে ৩ মাস, এজন্য আমি কিছুই বলতে পারব না।" কম্পিউটার অপারেটর অফিস সহকারি এবং ডুপলির মাধ্যমে সাইট পরিচালনার ব্যাপারে তার পদক্ষেপের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, "আপনারা যে রিপোর্ট করেছেন সেটা আমি সি আর ও (প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা) স্যারের তত্ত্বাবধানে দিয়ে দিয়েছি, এটা একটু দেখেন স্যার কিভাবে কি!" অফিস প্রধান হিসেবে তার দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, " দায়িত্ব যেইটা আছে সেটা করি, সি আর ও স্যার হলো আমাদের প্রধান, সি আর ও স্যারের কনসার্ন ছাড়া আমি কিছু করি না। তার অনুমোদন ছাড়া কিছুই হয় না।"
এসব অনিয়ম সম্পর্কে জানতে বার্তা বিচিত্রার অনুসন্ধানী টিম হাজির হয় ঢাকা ওয়াসার প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তার দপ্তরে। মোঃ আনোয়ার হোসেন প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ক্যামেরার সামনে কথা বলতেই অস্বীকৃতি জানান।
সরকারি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান ঢাকা ওয়াসার একটি গুরুত্বপূর্ণ জোন কীভাবে সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে, তার জ্বলন্ত উদাহরণ জোন-১। দুর্নীতির এই চিত্র কেবল একটি জোনের নয়, বরং পুরো ব্যবস্থাপনার গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
প্রশ্নের মুখে পুরো ওয়াসা প্রশাসন
পাহাড়সম দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসার পরও সংশ্লিষ্টদের নীরবতা নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—
এই দুর্নীতির পেছনে কি আরও বড় কোনো শক্তি কাজ করছে?
ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কি অসহায়, নাকি তারা নিজেই এই সিন্ডিকেটের অংশ?
মোঃ বশির আহমেদ সানির অনুসন্ধানে ৭ পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের পরবর্তী পর্ব পড়তে চোখ রাখুন বার্তা বিচিত্রার পাতায়।