অপেক্ষার পালা সাঙ্গ হল রমিজ উদ্দিনের

Date: 2024-10-05
news-banner

 

আব্দুল্লাহ আল মামুন (প্রধান প্রতিবেদক):

 

রমিজ উদ্দিনের জীবনে আর কোনো অপেক্ষা নেই। ছেলে মো. হালিম ঘরে ফিরলেই তার দিকে ফ্যাল-ফ্যাল করে তাকিয়ে সে আর জিজ্ঞেস করবে না “টাহা পাইছসরে বাজান, কি আনছস আমার লাইগা?” এ কথাগুলো রমিজ উদ্দিন আর কখনোই বলবে না। সে আর কোনো কিছুর জন্য অপেক্ষাও করবে না। দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করে করে একরাশ মনোকষ্ট নিয়ে বৃহস্পতিবার (৯ অক্টোবর) রাতে অপেক্ষার পালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে না ফেরার দেশে চলে যান ৮৭ বছরের বৃদ্ধ (সিনিয়র সিটিজেন) রমিজ উদ্দিন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

 

অভাবগ্রস্ত বৃদ্ধ রমিজ উদ্দিনের অপেক্ষা ছিল সরকারের কাছ থেকে তাঁর পাওনা টাকাগুলো হাতে পাবার। সেই টাকা দিয়ে ভালো-মন্দ কিছু কিনে খাওয়ার। আর ইচ্ছে ছিল এই বৃদ্ধ বয়সে বার্ধক্যজনিত কারনে নড়বড়ে শরীরটা নিয়ে ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়ে কিছুটা হলেও শারীরিক কষ্ট লাঘব করবার। কিন্তু সেই সাধ পূরণ হয়নি রমিজ উদ্দিনের। বৃদ্ধ পিতার প্রতিনিধি হয়ে দীর্ঘ সময় চেষ্টা করেও সরকারের কাছ থেকে তাঁর ন্যয্য পাওনা টাকা তুলে আনতে পারেনি ছেলে মো. হালিম। এ টাকা, সরকারি রাস্তা বানাতে অন্যান্য অনেকের ভূমির মতো রমিজ উদ্দিনেরও বেশকিছু ভূমি অধিগ্রহনের ক্ষতিপূরণের টাকা।

 

জানা যায়, জনসার্থে ‘ঘোড়াশাল-ডাঙ্গা’ বাইপাস রাস্তা বানাতে সরকার ব্যক্তি মালিকানাধীন বেশ কিছু ভূমি অধিগ্রহন করে। এই লক্ষ্যে নরসিংদী জেলার পলাশ থানাধীন ঘোড়াশাল মৌজার ৬৫৮ নং খতিয়ান, ৪০৪৮ নং দাগে ৩৩ শতাংশ ভূমি রয়েছে। যার মধ্যে ৫ শতাংশ ভূমির মালিক রমিজ উদ্দিন। এই ৩৩ শতাংশ ভূমির মালিকদের অনেকেই তাদের ক্ষতিপূরণের টাকা তুলে নিলেও রমিজ উদ্দিনের ফাইলটি আটকে যায় নরসিংদী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে। বছর পেরিয়ে দীর্ঘ সময় বিভিন্ন চেষ্টা-তদবির করেও ফাইলটির কোনো কুল-কিনারা করতে না পেরে রমিজ উদ্দিনের ছেলে মো. হালিম বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রতিবেদন প্রকাশের নিমিত্তে ‘বার্তা বিচিত্রা’ পত্রিকার শরণাপন্ন হন। তার লিখিত আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই প্রতিবেদক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে মুঠোফোনে কথা বলতে চাইলে আশানুরুপ সাড়া না পেয়ে সরেজমিন সাক্ষাতে কথা বলার জন্য গত ১৩/০৫/২০২৪ খ্রি. তারিখ নরসিংদী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অভিযোগকারী মো. হালিমসহ উপস্থিত হন।

 

এ সময় সার্ভেয়ার মাহবুব হোসেন ও কানুনগো মোস্তফা কামাল সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কথা বলতে এবং ফাইলটির বিষয়ে কোনোরুপ তথ্য জানাতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। সেই সাথে মোস্তফা কামাল কয়েকজন প্রভাবশালী সাংবাদিকের নাম উল্লেখ করে তাঁরা তাঁর ঘনিষ্টজন বলে জানান এবং নিজেও তার বক্তব্যের উপর প্রভাব দেখান। কিন্তু নাছোড়বান্দা এই প্রতিবেদক বিনয়ের সাথে তার কাছে জানতে চান, “ফাইলটি বর্তমানে কোথায় এবং কী অবস্থায় আছে, সেটি জানার অধিকার কি ভুক্তভোগীর নেই?” এ সময় তিনি দেড় ঘন্টা সময় চেয়ে নেন। তিনি বলেন, “আপনারা ঘন্টা দেড়েক পরে আসেন।”

 

ঘন্টা দেড়েক পর মোস্তফা সাহেবের টেবিলের সামনে যেতেই উনি চেয়ারে বসতে অনুরোধ জানালেন এবং ধমকের সুরে পিয়নকে ডেকে চা পরিবেশনের আদেশ দিলেন। খুব বিনয়ের সাথে হাসিমুখে বলেন, মো. হালিমের ফাইলটিতো আমাদের কাছে নাই। ফাইলটি আমরা পুণঃতদন্তের জন্য উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে গতকাল পাঠিয়ে দিয়েছি। যার রিসিভ কপি প্রশাসনিক কর্মকর্তার টেবিলে অছে। প্রশাসনিক কর্মকর্তা নাঈম সাহেবের টেবিলে গিয়ে বিষয়টি বলা মাত্রই তিনি রিসিভ কপিটি বের করে দিলেন।  সেখানে দেখা যায়, ‘অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. মোস্তফা মনোয়ার (রাজস্ব) স্বক্ষরিত অদেশপত্রে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরেজমিনে তদন্ত পূর্বক সংস্পষ্ট মতামতসহ বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সহকারী কমশিনার (ভূমি), পলাশ, নরসিংদীকে অনুরোধ করা হয়েছে।’ আদেশপত্রে মামলার ধরণ: বিবিধ মোকদ্দমা নং-১৯৫/২০২২, এল এ কেস নং-০১/২০২১-২২ এবং পরবর্তী শুনানীর তারিখ- ১১-০৬-২০২৪ খ্রি. উল্লেখ রয়েছে। যেটি ভুমি অফিস রিসিভ করেছে ১২-০৫-২০২৪ খ্রি. তারিখ।

 

ঐদিনই উপজেলা ভূমি অফিসে গিয়ে সার্ভেয়ার বাসুদেব সাহা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা আমিনুল ইসলামের সাথে কথা বলে জানা যায় যে, এই আদেশপত্রটি গতকালই এসেছে এবং আমিনুল ইসলাম নিজে স্বাক্ষর করে রিসিভ করেছেন। আমিনুল ইসলাম আরো জানান যে, সরেজমিনে গিয়ে জায়গার সিমানা নির্ধারণ করে দ্রুত প্রতিবেদন তৈরি করা হবে এবং আদেশপত্রে উল্লেখিত তারিখের আগেই ডিসি অফিসে প্রতিবেদনটি প্রেরণ করা হবে।

 

প্রতিবেদন প্রেরণ, ডিসি অফিসে মামলার শুনানী অতঃপর ন্যায্য হিসাব বুঝে পাওয়া এর কোনোটিই দেখে যেতে পারেননি বার্ধক্যজনিত রোগে কাতর, আশায় অপেক্ষমান ৮৭ বছরের বৃদ্ধ রমিজ উদ্দিন। এর দায়ভার কার? ‘বার্তা বিচিত্রার’ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দেখুন আগামী সংখ্যায়। 

Leave Your Comments