মাসুদুর রহমান
খুলনা প্রতিনিধি:
বিগত দু-এক মাসের অধিক সময় ধরে খুলনা জেলায় সন্ত্রাসীদের হাতে বেশ কয়েকজন খুন, অঙ্গহানি ও বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়েছে। বেশিরভাগই এসব সন্ত্রাসীরা এই জঘন্য কাজ গুলো তারা সন্ধ্যার পর পরই ঘটিয়ে থাকে। যেটাকে এক কথায় ‘নাইট ক্রাইম’ বলা হয়। খুলনা জেলার পুলিশ প্রশাসনের নিস্ক্রিয়তার কারণেই এই সন্ত্রাসী কর্মকান্ড বৃদ্ধি পেয়েছে বলে নগরবাসীরা অভিযোগ করেছেন।
যারা এই ধরনের ঘৃনিত কাজের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে, তথ্য সূত্রে জানা যায়, তারা দীর্ঘদিন পলাতক ও জেলে থাকা চিহ্নিত সন্ত্রাসী। তারা খুলনা জেলা সহ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করে থাকে। তবে তারা আধিপাত্য বিস্তারের লক্ষে তারা কিছু কিশোর গ্যাং, বখাটে ও উঠতি বয়সী কিশোরদের সাথে নিয়ে এই ধরনের অপরাধের সাথে জড়িত এইসব সন্ত্রাসীরা। গত একমাসেরও বেশি সময় ধরে চলছে এই ধরনের বেপরোয়া ‘নাইট ক্রাইম’। আধিপাত্য বিস্তারের জন্য তারা খুলনা জেলায় বিভিন্ন পাড়া মহল্লায় সশস্ত্র মহড়া দিচ্ছে। এ অবস্থায় খুলনা জেলার প্রশাসনের ভুমিকায় সন্তুষ্ঠ নয় খুলনা জেলার নগরবাসী।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের একাধিক সূত্র জানা যায় যে, মাদক কারবারির টাকা ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় খুলনা জেলার এক সন্ত্রাসীর সাথে বিরোধ হয় শেরে এ বাংলা রোডের আমতলা এলাকার বাসিন্দা আব্দুল মান্নানের ছেলে রাসেল ওরফে পঙ্গু রাসেলের। তাকে হত্যার জন্য পরিকল্পনা করতে থাকে ঐ সন্ত্রাসী। সন্ত্রাসীদের পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ০৩-১১-২০২৪ তারিখ রাতে রাসেল ওরফে পঙ্গু রাসেলকে ফোন করে তাকে জিরোপয়েন্টে ডেকে নিয়ে যাই এবং রাসেল ওরফে পঙ্গু রাসেলকে সাথে নিয়ে তারা খাবার খেতে যায় খাবার খাওয়ার পর আনুমানিক রাত ৩ টার দিকে রাসেল ওরফে পঙ্গু রাসেলকে সোনাডাঙ্গা থানার কুবা মসজিদ গলির সম্মুখে এনে তাকে গুলি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়েই হত্যাকান্ডটি ঘটনায় এই সন্ত্রাসীরা।
একই রাতে বাড়িতে যাওয়ার পথে কমার্স কলেজের পাশে সন্ত্রাসীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর জখম হন খুলনা জেলা যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক মো: হাবিবুর রহমান বেলাল। আবার গত ৩০-১১-২০২৪ রাতে সন্ত্রাসীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত হন ৩০ নং ওয়ার্ড বিএনপি’র সদস্য সচিব আমির হোসেন বোয়িং মোল্লা। এরপর হাসপাতালে ৪ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর মারা যান ৩০ নং ওয়ার্ড বিএনপি’র সদস্য সচিব আমির হোসেন বোয়িং মোল্লা। এ ঘটনায় নিহত ব্যক্তির পরিবার খুলনা থানায় একটি মামলা দায়ের করেন কিন্তু মামলা দায়ের এর পরও এখন পর্যন্ত কোন সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার বা আটক করেননি খুলনা জেলার পুলিশ প্রশাসন। পুলিশ প্রশাসনের এমন কাযর্ক্রম দেখে হতাশ আমির হোসেন বোয়িং মোল্লা পরিবারের সদস্যরা।
এদিকে নাজিরঘাট এলাকার বাসিন্দা ইউনুস ছিলেন এক সময়ে মাদক কারবারের অন্যতম হোতা। মাদক কারবার ছেড়ে দিয়ে তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছিলেন। সন্ত্রাসীরা মাদক বিক্রির জন্য ক্রমাগত ইউনুসকে চাপ দিচ্ছিল। কিন্তু ইউনুস রাজি না হওয়ায় সন্ত্রাসীরা তাকে নাজিরঘাট এলাকার বাড়ি থেকে ডেকে ০৫-১২-২০২৪ তারিখ রাতে ইউনুসকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করে। কিন্তু লক্ষভ্রষ্ট হওয়ায় তিনি প্রাণে বেঁচে যান।
এদিকে গত ১২-১২-২০২৪ তারিখ রাতে নগরীর লবণচরা থানাধীন একটি ফিলিং স্টেশনের সামনে সন্ত্রাসীরা রেজা শেখের ওপর হামলা চালায়। এ হামলায় রেজা শেখ তার বাম পা হারান। বর্তমানে তিনি খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আছেন। রেজা শেখ পরিবারের পক্ষ থেকেও থানায় মামলা দায়ের করা হলে এখন পর্যন্ত কোন আসামি গ্রেপ্তার হয়নি।
সর্বশেষ ১৩-১২-২০২৪ তারিখ রাতে মিয়াপাড়া বন্ধনের মোড়ে আড্ডারত ছিলেন আকাশ নামের এক যুবক। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আকাশকে হত্যার লক্ষ্য করে পরপর ২ টি গুলি করে সন্ত্রাসীরা। একটি গুলি আকাশের কোমরের পেছনে বিদ্ধ হয়। বর্তমানে আকাশ ও খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আছেন। আকাশের পরিবার থেকে জানা যায় যে পূর্বেও আকাশের বাবা এই সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হয়েছিলেন। এ ঘটনার পর তার পরিবারের সদস্যরা আতংকিত রয়েছেন। নামপ্রকাশ না করার শর্তে পরিবারের এক সদস্য বলেন, মামলা করে আগেও কোন লাভ হয়নি এখনও হবেনা।
এদিকে খুলনায় ‘নাইট ক্রাইম’ বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন খুলনা নগরবাসীরা। বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার খুলনা বিভাগীয় কো-অর্ডিনেটর এ্যাডভোকেট মোমিনুল ইসলাম উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, গত ০৫-০৮-২০২৪ তারিখের আগে পুলিশের যে ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়েছিল তা থেকে তারা এখনো বের হয়ে আসতে পারেনি। তাদের মধ্যে বিব্রতকর অবস্থা বিরাজ করছে। এ অবস্থা দ্রুত কাটিয়ে উঠতে হবে। পাশাপাশি জনগণের সহযোগিতা নিয়ে পুলিশ সাহসের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করলে অপরাধ কমে আসবে।
সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে উদ্বেগ প্রকাশ করে খুলনা মহানগর বিএনপি’র আহবায়ক এড. শফিকুল আলম মনা বলেন, ইদানিং খুলনায় অপরাধ প্রবণতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অপরাধী যত বড় হোক না কেন তাদের কঠোর হস্তে দমন করে জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে হবে।
জানতে চাইলে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো: জুলফিকার আলী হায়দারও বলেন, সন্ত্রাসী কার্যক্রম দমনের সকল চেষ্টা চালানো হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে আমরা সফলতা পেয়েছি এবং কিছু ক্ষেত্রে আমরা ব্যর্থ।
কারণ হিসেবে তিনি বলেন, খুলনা শহরে প্রবেশ করার অনেক পথ রয়েছে। সন্ত্রাসীরা হঠাৎ নগরীরতে প্রবেশ করে কার্যক্রম চালিয়ে সটকে পড়ছে। সন্ত্রাসীরা পুলিশের চোখ ফাঁকি দেওয়ার নানা কৌশল অবলম্বন করছে। এটা যেন সন্ত্রাসীরা আর না করতে পারে আমরা সেই ব্যবস্থা নিচ্ছি। অচিরেই এই সব সন্ত্রাসমূলক কার্যক্রম বন্ধ হবে বলে তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেছেন।