শামীম আহমেদ জয় :
চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে নিয়মিতভাবে বসছে জুয়ার জমজমাট আসর। এসব আসরে কৃষক, শ্রমিক, বিভিন্ন পেশাজীবীসহ উঠতি বয়সী যুবক ও স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। জুয়ার পাশাপাশি একই স্থানে দেদারসে চলছে মাদক বিক্রি ও সেবন। ফলে এলাকায় দিন দিন বাড়ছে চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির মতো অপরাধ।
১৭ জানুয়ারী দিবাগত রাতে সাংবাদিক জহিরুল ইসলাম মিনটুর ষাটনল কনু মার্কেট তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ও এক সপ্তাহ ব্যবধানে উপজেলার একলাছপুর ইউনিয়নের সাংবাদিক তুহিন ফয়েজ এর বাড়িতে তালা ভেঙে চুরি, ছেংগারচর বাজারে বাজারে সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম রানার ফ্ল্যাটে চুরি করে নগদ টাকাসহ স্বর্ণালংকার নিয়ে যায়, শুক্রবার ছেংগারচরে আরেকটি ফ্ল্যাটের তালা ভেঙে চুরির এর কিছুদিন পূর্বে দেওয়ানজীকান্দি গ্রামের সাদেক মালের বাড়িতে সিঁধ কেটে চুরি, দুলালকান্দি গ্রামে অটো রিক্সা চুরি, একলাশপুর গ্রামে একই রাতে তিন ঘরে চুরি'সহ বিভিন্ন জায়গায় প্রতিনিয়ত ঘটছে চুরিও ছিনতাই।
অন্যদিকে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মিলারচর, সটাকী, বাবু বাজার, দশানী, মোহনপুর, এখলাছপুর, সুজাতপুর, নতুন বাজার, গজরা বাজার, কালীরবাজার, সাহেব বাজার, টরকি, সাদুল্লাপুর ইউনিয়নের বেলতলী সওদাগর বাড়ি, ছেংগারচর'সহ বিভিন্ন এলাকায় জুয়ার আসরে হাজার হাজার টাকা উড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ফিজিক্যাল জুয়ার পাশাপাশি অনলাইন জুয়ার আসক্তিও বেড়েছে। মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহার করে অনেক যুবক নিজেদের সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ছেন। জুয়া খেলার জন্য তারা পরিবারিক সম্পদ গচ্ছিতভাবে খরচ করছেন, ঋণ নিচ্ছেন এবং কখনও কখনও চুরি ও ছিনতাই করে জুয়ার টাকা যোগাড় করছেন। ফলে পরিবার ও সমাজে তীব্র নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
মাদকের মতোই জুয়ার ছোবলে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। জুয়াকে কেন্দ্র করে ঘরে ঘরে বাড়ছে পারিবারিক কলহ। বিশেষ করে উঠতি বয়সী যুবক ও শিক্ষার্থীদের জুয়ায় জড়িয়ে পড়া নিয়ে চরম উদ্বেগে রয়েছেন অভিভাবকরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, জুয়া বন্ধে পুলিশের কার্যকর তৎপরতা না থাকায় সমাজে এই ক্ষতিকর প্রবণতা দিন দিন বেড়েই চলেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, দশানী নদীর পাড়সহ আশপাশের বিভিন্ন বাড়ি ও বাগানে নিয়মিত জুয়ার আসর বসছে। সটাকী বাজার ও কালীর বাজারের কয়েকটি দোকানে দীর্ঘদিন ধরে চলছে জুয়া।মিলারচর চুন্নু সরকারের বাড়ীর আশপাশে নিরিবিলি হওয়ায় নিরাপদ মনে করেন জুয়ারীরা, নন্দলালপুরের সিরাজ বেপারীর বাড়ি ও আশপাশের এলাকায় রীতিমতো জুয়ার আসর বসে। এ ছাড়া ইমামপুর, হানিরপাড়, পালালোকদি এলাকাসহ প্রায় সব গ্রামেই কমবেশি জুয়া খেলার অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, ছেংগারচর বাজারের আশপাশের এলাকায় অন্তত ৮ থেকে ১০টি পয়েন্টে নিয়মিত জুয়া ও মাদকের আসর বসে।
সূত্র মতে, বাবু বাজার এলাকায় সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত চলে জুয়ার আসর। স্থানীয়দের অভিযোগ, ইয়াবা সম্রাট জনির বাড়িতে জমজমাটভাবে জুয়া ও মাদক ব্যবসা চলে। এছাড়া সাদুল্লাপুর ও দুর্গাপুর আশ্রয়ন প্রকল্প এলাকায় মাদক বিক্রি ও ইয়াবা সেবনের পাশাপাশি জুয়ার আসর বসছে। আশ্রয়ন প্রকল্পগুলো ধীরে ধীরে মাদকের আখড়ায় পরিণত হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত এবং কোথাও সকাল থেকেই রাত অবধি চলে জুয়ার আসর। জুয়া ও মাদকের অবাধ বিস্তারের ফলে এলাকার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে ছোট-বড় চুরির ঘটনা।নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন গ্রামের সচেতন মানুষ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দশানী গ্রামের একাধিক ব্যক্তি জানান, কিছুদিন আগে রাতে ৫ থেকে ৬ জন ও টরকি থেকে দুলাল নামে এক জুয়ারিকে পুলিশ আটক করে থানায় নিয়ে যায়। পরে জামিনে বের হয়ে তারা আবারও জুয়ার আসর বসায়। ইতিমধ্যে এলাকায় একাধিক চুরির ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদক ও জুয়ার টাকা জোগাড় করতেই এসব চুরি-ছিনতাই করছে জুয়ারিরা।
সচেতন মহলের দাবি, জুয়া বন্ধ করা গেলে এলাকায় চুরি, ছিনতাই, ডাকাতিসহ অপরাধের প্রবণতা অনেকাংশে কমে আসবে। তারা দ্রুত কার্যকর ও ধারাবাহিক অভিযানের মাধ্যমে জুয়ার আসর বন্ধের জোর দাবি জানিয়েছেন।
মতলব উত্তর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল হাসান বলেন, জুয়া একটি সামাজিক ব্যাধি। জুয়ার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে তরুণ সমাজকে এই ব্যাধি থেকে মুক্ত করতে পুলিশি অভিযানের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি।