এস আই খান:
ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্প যেন সাধারণ মানুষের জন্য আশীর্বাদের চেয়ে দালালি সিন্ডিকেটের কাছে বেশি আয়ের সুযোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নরসিংদীর বেলাবো উপজেলায় ভূমি অধিগ্রহণের বিল পাইয়ে দেওয়ার নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একটি শক্তিশালী চক্রের বিরুদ্ধে। এই চক্রের মূল হোতা হিসেবে উঠে এসেছে জনৈক মো: স্বপন মাহমুদ ও মুকুল খন্দকারের নাম। ভুক্তভোগীদের দাবি, এলএ (Land Acquisition) অফিসের নাম ভাঙিয়ে এই চক্রটি ব্লাঙ্ক চেক ও স্ট্যাম্প জমা নিয়ে সাধারণ মানুষকে সর্বস্বান্ত করছে।
ভুক্তভোগীর আর্তনাদ: টাকা দিয়েও মিলছে হুমকি
বেলাবোর নারায়ণপুর এলাকার বাসিন্দা মো: খাইরুল ইসলাম এই চক্রের নির্মম শিকার। অনুসন্ধানে জানা যায়, তার স্থাপনাটি ১৩/২০২১-২০২২ এলএ কেসের অধীনে অধিগ্রহণের তালিকায় পড়ে। সরকারিভাবে বিল পাসের প্রক্রিয়া শুরু হলে 'দালাল' চক্রের সদস্য স্বপন মাহমুদ ও মুকুল খন্দকার তাকে ৫ লক্ষ টাকার বিনিময়ে দ্রুত বিল উত্তোলনের টোপ দেন।
ভুক্তভোগী খাইরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, "গত ৩০ আগস্ট ২০২৩ তারিখে আমি নগদ ৩ লক্ষ টাকা এবং ডাচ-বাংলা ব্যাংকের তিনটি স্বাক্ষর করা ব্লাঙ্ক চেক ও স্ট্যাম্প তাদের হাতে তুলে দেই। কিন্তু পরে জানতে পারি তাদের কোনো বৈধ ক্ষমতা নেই। টাকা ফেরত চাইলে আমাকে অপহরণ ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।"
অপহরণের নাটক ও মধ্যরাতে পুলিশের অভিযান
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত ৩ নভেম্বর ২০২৫ তারিখ গভীর রাতে খাইরুল ইসলামকে তার বাসা থেকে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করে একটি প্রাইভেট কারে আসা দুর্বৃত্তরা। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করলে বেলাবো থানা পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছালে অপরাধীরা পালিয়ে যায়। এই ঘটনায় গত ৫ নভেম্বর বেলাবো থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং: ২২২) দায়ের করা হয়েছে এবং র্যাব-১১-তে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
এলাকাবাসীর দাবি, স্বপন মাহমুদের নিজস্ব একটি 'বাহিনী' রয়েছে যারা এলএ অফিসের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে সাধারণ জমির মালিকদের তালিকা সংগ্রহ করে। এরপর ভয়ভীতি বা প্রলোভন দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে অগ্রিম চেক ও স্ট্যাম্প আদায় করে। টাকা না দিলে স্থাপনায় তালা লাগিয়ে দেওয়া বা বিল আটকে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে।
বেলাবো থানার ডিউটি অফিসার জানান, ভুক্তভোগী খাইরুল ইসলামের জিডি গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিক তদন্তে জমি সংক্রান্ত বিরোধ ও অর্থ লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।
অন্যদিকে, র্যাব-১১ সূত্রে জানা গেছে, সরকারি প্রকল্পের নাম ভাঙিয়ে যারা চাঁদাবাজি বা প্রতারণা করছে, তাদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা নজরদারি চালানো হচ্ছে।
এলাকার সাধারণ মানুষের দাবি, এই দালাল সিন্ডিকেট শুধু খাইরুল ইসলাম নয়, বরং নারায়ণপুর ও বেলাবো এলাকার আরও অনেকের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এই সিন্ডিকেটের সদস্যদের গ্রেফতার এবং ক্ষতিগ্রস্তদের চেক ও স্ট্যাম্প উদ্ধারে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
অভিযুক্ত মুকুর খন্দকার তার বিরুদ্ধে আনিত সকল অভিযোগ আস্বীকার করে বলেন, এই দালাল সিন্ডিকেটের সাথে স্বপন মাহমুদ জড়িত আমি নয়। আমাকে অযথা অভিযুক্ত করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন স্বপন মাহমুদ নরসিংদীর কয়েকজন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে টাকা এনে মহাসড়কের পাশে বিল্ডিং নির্মাণ করার জন্য টাকা দেয়। বিনিময়ে স্বপন তাদের কাছ থেকে স্ট্যাম্প ও চেক নেয়।
অভিযুক্ত স্বপন মাহমুদের মোবাইল নাম্বারে একাধিকবার চেষ্টা করার পরও ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।