নিজস্ব প্রতিবেদক
গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগ–৩-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মইনুল ইসলামের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা যাচাইয়ে তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের প্রস্তুতি নিচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
দুদক সূত্র জানায়, একজন প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তার সর্বোচ্চ মাসিক বেতন যেখানে প্রায় ৬৫ হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ, সেখানে মো. মইনুল ইসলামের জীবনযাত্রা ও ব্যয়ের ধরন সেই আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে এসব অভিযোগ লিখিত আকারে দুদকে পৌঁছালে বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পায়।
বিলাসী জীবনযাপন নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগ অনুযায়ী, মো. মইনুল ইসলামের একমাত্র সন্তান রাজধানীর একটি ব্যয়বহুল ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াশোনা করছে, যেখানে মাসিক ব্যয় প্রায় ৩০ হাজার টাকা। এ ছাড়া তিনি সম্প্রতি প্রায় ৬৫ লাখ টাকা মূল্যের একটি বিলাসবহুল গাড়ি ক্রয় করেছেন এবং সার্বক্ষণিক ব্যক্তিগত ড্রাইভার ব্যবহার করছেন।
দুদক সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, একজন সরকারি প্রকৌশলীর নিয়মিত বেতন ও বৈধ আয়ের সঙ্গে এ ধরনের ব্যয় ও জীবনযাপন স্বাভাবিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ বিষয়টিকেই অনুসন্ধানের প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পাঁচ তারকা হোটেল ও ব্যয়বহুল অভ্যাস
সূত্রের দাবি, মো. মইনুল ইসলাম নিয়মিত রাজধানীর গুলশান ও বনানী এলাকার পাঁচ তারকা হোটেলে যাতায়াত করেন এবং ব্যয়বহুল ব্যক্তিগত সামগ্রী ব্যবহার করেন। এসব ব্যয়ের নির্ভরযোগ্য আর্থিক উৎস কী—তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
দুদকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “কোনো সরকারি কর্মকর্তার জীবনযাত্রা যদি তার ঘোষিত আয়ের সঙ্গে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি করে, তাহলে সেটি অনুসন্ধানের যৌক্তিক কারণ হয়ে দাঁড়ায়।”
কুড়িগ্রামে রিসোর্ট প্রকল্পে সম্পৃক্ততার অভিযোগ
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, কুড়িগ্রাম জেলায় প্রায় ১০ একর জমির ওপর নির্মাণাধীন একটি রিসোর্ট প্রকল্পের সঙ্গে মো. মইনুল ইসলামের সম্পৃক্ততা রয়েছে। ওই প্রকল্পে বিনিয়োগকৃত অর্থের উৎস নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি চাকরিজীবী হয়েও এত বড় পরিসরের প্রকল্পে বিনিয়োগ কীভাবে সম্ভব হয়েছে—তা খতিয়ে দেখতেই দুদক আগ্রহী বলে জানা গেছে।
টেন্ডার ও বিল পাসে অনিয়মের অভিযোগ
দুদক সূত্র জানায়, গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে টেন্ডার প্রক্রিয়া, বিল পাস এবং কাজের ভেরিয়েশন অনুমোদনের ক্ষেত্রে ঠিকাদারদের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে মো. মইনুল ইসলামের বিরুদ্ধে।
সম্প্রতি বাকি বিল্লাহ নামের এক ব্যক্তি এসব অভিযোগ লিখিতভাবে দুদকে দাখিল করেন। বর্তমানে অভিযোগগুলোর প্রাথমিক যাচাই-বাছাই চলছে।
যেসব নথি খতিয়ে দেখা হতে পারে
দুদক সূত্র জানিয়েছে, অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে—
মো. মইনুল ইসলামের সম্পদ বিবরণী
ব্যাংক হিসাব ও আর্থিক লেনদেন
সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের নথিপত্র
পর্যালোচনা করা হবে। প্রয়োজনে তাকে তলব করে জিজ্ঞাসাবাদও করা হতে পারে।
মন্তব্য পাওয়া যায়নি
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মইনুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মত
দুর্নীতি ও সুশাসন নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে আয় ও জীবনযাত্রার মধ্যে বড় ধরনের বৈষম্য থাকলে সেটি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাদের মতে, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণই প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারে।
পরবর্তী পর্বে প্রকাশিত হবে—মো. মইনুল ইসলামের সম্পদ বিবরণী ও সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর বিস্তারিত বিশ্লেষণ।