নীল অর্থনীতি থমকে গেছে

Date: 2026-01-20
news-banner


স্টাফ রিপোর্টার 
বাংলাদেশের সমুদ্রসীমাকে ঘিরে নীল অর্থনীতির যে সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল, তার বাস্তব প্রতিফলন ঘটার আগেই বড় এক প্রকল্প থমকে গেছে। মৎস্য অধিদপ্তরের ‘সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ’ শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যর্থ হওয়ায় বিশ্বব্যাংকের প্রায় হাজার কোটি টাকা অব্যবহৃত অবস্থায় ফেরত যাচ্ছে। এতে উপকূলীয় এলাকার জেলে ও মৎস্যজীবীরা যেমন প্রত্যাশিত সুফল পাননি, তেমনি প্রশ্ন উঠেছে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়েও।
২০১৮ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৮৬৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। লক্ষ্য ছিল উপকূল ও সামুদ্রিক মৎস্য খাতকে আধুনিক করা, মাছ সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ উন্নত করা এবং জেলেদের জীবনমান বাড়ানো। প্রকল্পের মেয়াদ শেষে দেখা যাচ্ছে, নির্ধারিত লক্ষ্যগুলোর বড় অংশই অধরাই থেকে গেছে।
জমি সংকটেই আটকে প্রকল্প
প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল উপকূলীয় এলাকায় ১৮টি আধুনিক ফিশ ল্যান্ডিং সেন্টার নির্মাণ। এসব কেন্দ্র গড়ে ওঠার কথা ছিল মাছ ওঠানো, সংরক্ষণ, মান নিয়ন্ত্রণ ও রপ্তানির কেন্দ্র হিসেবে। কিন্তু সাড়ে সাত বছরেও এসব কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ শেষ করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
মৎস্য অধিদপ্তর জমির মালিকানা জটিলতার কথা বলছে। তবে উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন—প্রকল্প গ্রহণের আগে যদি জমি-সংক্রান্ত ঝুঁকি যাচাই না করা হয়, তাহলে এত বড় বাজেটের উদ্যোগ নেওয়া হলো কীভাবে?
জমি সংকটের প্রভাব পড়ে প্রকল্পের অন্যান্য অবকাঠামোতেও। পরিকল্পিত ১৬টি সার্ভিল্যান্স চেকপোস্টের মধ্যে হয়েছে মাত্র ৫টি। ১৬টি ফিশারিজ পন্টুনের জায়গায় নির্মিত হয়েছে ৬টি। ফলে উপকূলীয় নজরদারি ও সেবা কাঠামো দুর্বলই থেকে গেছে।
কাগজে বাস্তবায়ন, মাঠে নেই পরিবর্তন
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নথিতে বাস্তবায়নের হার দেখানো হচ্ছে প্রায় ৯৭ শতাংশ। কর্তৃপক্ষ বলছে, ডলারের দর পরিবর্তন, কোভিড-১৯–এর কারণে বিদেশি কার্যক্রম বাতিল এবং দরপত্রে কম দাম পাওয়ায় অর্থ সাশ্রয় হয়েছে।
তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। খুলনা, পটুয়াখালী, বরগুনা ও কক্সবাজারের জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁদের জীবন ও কাজে প্রকল্পের প্রভাব খুবই সীমিত।
বরগুনার পাথরঘাটার এক জেলে বলেন,
“শুনেছি বড় প্রকল্প হয়েছে। কিন্তু ঘাট আগের মতোই ভাঙা, মাছ রাখার কোনো আধুনিক ব্যবস্থা নেই। আমাদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি।”
নজরদারি বাড়ানোর সুযোগ হাতছাড়া
প্রকল্পের আওতায় সমুদ্রসীমায় অবৈধ মাছ শিকার রোধে ৮টি প্যাট্রোল বোট কেনার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু প্রশাসনিক অনুমোদনের জটিলতায় সেটিও বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে সামুদ্রিক সম্পদ সংরক্ষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হারিয়েছে দেশ।
একজন সামুদ্রিক গবেষক বলেন, “নীল অর্থনীতির কথা বললে শুধু উৎপাদন নয়, সুরক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রকল্পে সেই জায়গাটিই সবচেয়ে দুর্বল থেকেছে।”
কার দায়?
প্রকল্প পরিচালক জিয়া হায়দার চৌধুরী জানিয়েছেন, জমি জটিলতা প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। তাঁর দাবি, অর্থ ফেরত যাওয়া মানে ব্যর্থতা নয়; বরং হিসাব সংশোধনের ফল। তিনি বলেন, পরীক্ষামূলকভাবে হাজার হাজার নৌযানে জিএসএম ট্র্যাকিং চালু করা হয়েছে।
তবে অর্থনীতিবিদ ও উন্নয়ন বিশ্লেষকদের প্রশ্ন—যদি প্রকল্প সফলই হতো, তাহলে বিশ্বব্যাংকের এত বড় অঙ্কের অর্থ কেন ব্যবহার করা গেল না?
যে অর্থ দিয়ে উপকূলের লাখো মানুষের জীবনমান বদলে দেওয়া সম্ভব ছিল, সেই অর্থ আজ বিদেশে ফিরে যাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে শুধু একটি প্রকল্প নয়, নীল অর্থনীতিকে ঘিরে দেশের একটি বড় সম্ভাবনাও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
নীল অর্থনীতির স্বপ্ন এখনো কাগজে আছে, বাস্তবে তার প্রতিফলন খুঁজে পাচ্ছেন না উপকূলের মানুষ।

Leave Your Comments