এস আই খান
নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক বার্তা বিচিত্রা
ঢাকা—বদ্বীপ এই বাংলাদেশের হৃদপিণ্ড। চারশ বছরেরও বেশি প্রাচীন এই নগরীর পরতে পরতে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সংগ্রাম। কিন্তু আজ সেই হৃদপিণ্ডের ধমনীগুলো যানজট, দূষণ আর অব্যবস্থাপনার চর্বিতে রুদ্ধপ্রায়। প্রায় দুই কোটি মানুষের এই মেগাসিটি আজ বিশ্বের অন্যতম বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকায় বারবার উঠে আসছে। অথচ এই ঢাকাকে ঘিরেই আবর্তিত হয় আমাদের অর্থনীতি, রাজনীতি আর সংস্কৃতি। বর্তমান সরকারের 'স্মার্ট বাংলাদেশ' বিনির্মাণের যে মহাপরিকল্পনা, তার প্রথম ও প্রধান পরীক্ষা হওয়া উচিত ঢাকাকে কেন্দ্র করে। আর এই রূপান্তরের কারিগর হতে পারেন ঢাকার ২০টি সংসদীয় আসনের মাননীয় জনপ্রতিনিধিগণ।
একজন সংবাদকর্মী হিসেবে ঢাকার অলিগলি আর প্রশাসনিক দপ্তরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জমে থাকা সমস্যার চিত্র আমরা প্রতিদিন দেখি। বিশেষ করে ক্রাইম বিট সাংবাদিকতার দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় দেখেছি, কীভাবে ছোট ছোট অব্যবস্থাপনা বড় বড় অপরাধ আর নাগরিক ভোগান্তির জন্ম দেয়। 'সাপ্তাহিক বার্তা বিচিত্রা'র পক্ষ থেকে আমরা মনে করি, ঢাকার ২০ জন এমপি যদি নিজ নিজ এলাকায় সমন্বিত ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করেন, তবে ঢাকাকে আমূল বদলে ফেলা সম্ভব। সেই লক্ষ্যেই আমরা আমাদের সুনির্দিষ্ট দাবি ও প্রস্তাবনাগুলো বিশদভাবে পেশ করছি।
১. যানজট নিরসন: স্মার্ট ট্রাফিক ও আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা
ঢাকার প্রধান অভিশাপ হলো যানজট। যত্রতত্র পার্কিং এবং এনালগ ট্রাফিক ব্যবস্থা আমাদের জাতীয় কর্মঘণ্টাকে আক্ষরিক অর্থেই গিলে খাচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, যানজটের কারণে প্রতিদিন ঢাকায় কয়েক লক্ষ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, যার আর্থিক ক্ষতি বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা।
- * এআই (AI) নিয়ন্ত্রিত ট্রাফিক ব্যবস্থা: আমাদের দাবি, প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ন্ত্রিত স্মার্ট ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হোক। হাতের ইশারায় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যযুগীয় পদ্ধতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।
- * মাল্টি-লেভেল পার্কিং জোন: রাস্তার ওপর যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং যানজটের অন্যতম কারণ। প্রতিটি সংসদীয় এলাকায় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে (PPP) বহুতল পার্কিং ভবন নির্মাণ করতে হবে।
- * ফুটপাত উদ্ধার ও পথচারীবান্ধব নগরী: রাস্তার ওপর অবৈধ দখল ও হকারদের বিশৃঙ্খলা উচ্ছেদ করে পথচারীবান্ধব ফুটপাত গড়ে তোলা এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং সময়ের দাবি। সংসদ সদস্যদের উচিত হবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে এই দখলদারিত্বের অবসান ঘটানো।
২. পরিবেশ ও পরিচ্ছন্নতা: বাসযোগ্য ঢাকা বিনির্মাণ
সামান্য বৃষ্টিতেই ঢাকার 'জলবদ্ধতা' আমাদের উন্নয়নের সীমাবদ্ধতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। সামান্য বৃষ্টিতে যখন রাজপথ নদীতে রূপ নেয়, তখন আমাদের উন্নয়ন ভাবনাগুলো প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
- * ড্রেনেজ ও খাল উদ্ধার: ঢাকা একসময় খালের শহর ছিল। আজ সেই খালগুলো দখল আর আবর্জনায় ভরাট হয়ে গেছে। এমপিদের নিজ নিজ এলাকার খাল ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা দখলমুক্ত করে আধুনিকায়নে সরাসরি তদারকি করতে হবে।
- * ওয়েস্ট-টু-এনার্জি প্রকল্প: সনাতন পদ্ধতিতে বর্জ্য অপসারণের বদলে আধুনিক 'বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ' উৎপাদন প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। ঢাকাকে ডাস্টবিনমুক্ত শহর হিসেবে গড়ে তুলতে প্রতিটি ওয়ার্ডে আন্ডারগ্রাউন্ড ডাস্টবিন ও নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ নিশ্চিত করতে হবে।
- * তারের জঞ্জাল ও সবুজায়ন: মাথার ওপর ঝুলে থাকা তারের জঞ্জাল মাটির নিচে নিয়ে যাওয়া এখন সময়ের দাবি। এছাড়া প্রতিটি এলাকায় পর্যাপ্ত সবুজায়ন, পার্ক এবং খেলার মাঠ রক্ষা করা সংসদ সদস্যদের নৈতিক দায়িত্ব। আধুনিক নগরায়নে 'ভার্টিক্যাল ফরেস্ট্রি' বা দেয়াল বাগানের ধারণা যুক্ত করা যেতে পারে।
৩. স্মার্ট প্রশাসন ও নাগরিক সেবা
একজন নাগরিক যখন তার নূন্যতম সেবার জন্য ভোগান্তিতে পড়েন, তখন প্রশাসনের ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলেন। আমাদের লক্ষ্য হতে হবে 'মানুষ যাবে না সেবার কাছে, সেবা যাবে মানুষের কাছে'।
- * ডিজিটাল নাগরিক সেবা কেন্দ্র: প্রতিটি সংসদীয় এলাকায় এমন ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টার থাকতে হবে যেখানে জন্ম নিবন্ধন, হোল্ডিং ট্যাক্স, ট্রেড লাইসেন্সসহ যাবতীয় সেবা মিলবে এক ছাদের নিচে।
- * দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক দপ্তর: প্রশাসনিক দপ্তরে যে অনিয়মের চিত্র আমরা সংবাদকর্মী হিসেবে দেখি, তা বন্ধে সংসদ সদস্যদের কঠোর ভূমিকা নিতে হবে। প্রতিটি দপ্তরে সিসিটিভি মনিটরিং এবং অভিযোগ বক্স থাকতে হবে।
৪. নিরাপত্তা ও অপরাধ দমন: প্রযুক্তির ব্যবহার
ক্রাইম বিট সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতায় আমরা দেখি, অপরাধীরা অন্ধকার এবং নজরদারিহীন এলাকাকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নেয়।
- * সিসিটিভি ও সেন্ট্রাল মনিটরিং: পুরো ঢাকাকে ফেসিয়াল রিকগনিশন (Facial Recognition) সম্বলিত সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনতে হবে। প্রতিটি এলাকার প্রবেশ ও বাহির পথে কড়া নজরদারি থাকলে অপরাধের মাত্রা ৮০ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব।
- * উন্নত সড়ক আলোকসজ্জা: অন্ধকার গলি অপরাধের কেন্দ্রবিন্দু। ঢাকার প্রতিটি গলিতে এলইডি ল্যাম্পের মাধ্যমে দিনের আলোর মতো উজ্জ্বলতা নিশ্চিত করতে হবে।
- * কমিউনিটি পুলিশিং: এলাকার যুবসমাজকে মাদক ও অপরাধ থেকে দূরে রাখতে সংসদ সদস্যদের নেতৃত্বে কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
৫. শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য দূরীকরণ
ঢাকার ২০টি আসনের সব এলাকার শিক্ষার মান সমান নয়। অভিজাত এলাকার বাইরে যে এলাকাগুলো রয়েছে, সেখানে আধুনিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার অভাব প্রকট।
- * মডেল স্কুল ও হাসপাতাল: প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় অন্তত একটি করে আন্তর্জাতিক মানের সরকারি স্কুল এবং মাল্টি-স্পেশালিটি হাসপাতাল গড়ে তুলতে হবে। এতে বড় হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমবে এবং সাধারণ মানুষ দ্রুত সেবা পাবে।
- ৬. ২০ প্রতিনিধির কাছে আমাদের প্রত্যাশা
ঢাকার ২০ জন সংসদ সদস্য কেবল তাদের নিজ নিজ এলাকার নেতা নন, তারা পুরো দেশের নীতিনির্ধারক। আমরা প্রত্যাশা করি:
- * তারা দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে একটি সমন্বিত 'মাস্টার প্ল্যান' নিয়ে একযোগে কাজ করবেন।
- * মাসে অন্তত একবার এলাকার সাধারণ মানুষের মুখোমুখি হবেন এবং তাদের সমস্যা শুনবেন।
- * প্রকল্প বাস্তবায়নে শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবেন।
- পরিশেষ
ঢাকা কেবল ইট-পাথরের জঙ্গল নয়; এটি আমাদের গর্বের শহর, আমাদের অস্তিত্বের ঠিকানা। এই শহরকে তিলোত্তমা নগরী হিসেবে গড়ে তোলা অসম্ভব কোনো স্বপ্ন নয়, প্রয়োজন শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা আর আধুনিক পরিকল্পনা। ঢাকার ২০ জন সংসদ সদস্য যদি আগামী পাঁচ বছর ঢাকার ভাগ্য বদলে কাজ করেন, তবেই আমরা পাব একটি স্মার্ট ও বাসযোগ্য ঢাকা।
আমরা আশা করি, আমাদের জনপ্রতিনিধিরা কেবল নির্বাচনের সময় নয়, বরং সারা বছর জনগণের দুর্ভোগ লাঘবে রাজপথে থাকবেন। আপনারাই পারেন আগামীর প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য সুন্দর ঢাকা উপহার দিতে। 'সাপ্তাহিক বার্তা বিচিত্রা' সেই ইতিবাচক পরিবর্তনের সারথি হয়ে থাকতে চায়।