দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশের অঙ্গীকার বনাম ৫৮৮৭ কোটির খেলাপি বাস্তবতার সংঘাত

Date: 2026-01-28
news-banner

এস আই খান
 নির্বাহী সম্পাদক, বার্তা বিচিত্রা

​বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে ‘পরিবর্তন’ এবং ‘দুর্নীতিমুক্তি’ শব্দ দুটি সবসময়ই ভোটারদের আকর্ষণ করার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিশেষ করে ক্ষমতার বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলো যখন আগামীর রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা ঘোষণা করে, তখন তাদের কণ্ঠে সুশাসনের প্রতিশ্রুতি অত্যন্ত জোরালো হয়ে ওঠে। সম্প্রতি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের বিভিন্ন সভা-সমাবেশ এবং ভবিষ্যৎ ইশতেহারে দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার যে অঙ্গীকার ব্যক্ত করছে, তা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠ যখন আমরা দেখি, তখন সেই প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে জনমনে গভীর সংশয় আর প্রশ্নের পাহাড় তৈরি হয়। সম্প্রতি প্রকাশিত বিএনপির ১৩ জন প্রভাবশালী নেতার ৫,৮৮৭ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের যে খতিয়ান সামনে এসেছে, তা কেবল একটি সংখ্যা নয়; এটি দলটির ঘোষিত রাজনৈতিক দর্শনের সাথে তাদের বাস্তব আচরণের এক চরম বৈপরীত্য।


​প্রশ্নটি আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক—যারা নিজেদের শীর্ষ ও নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের আর্থিক অনিয়ম ও ব্যাংক লুণ্ঠন রোধ করতে পারছেন না, তারা ক্ষমতায় এসে গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রকে কোন জাদুমন্ত্রে দুর্নীতিমুক্ত করবেন? একটি দলের রাজনৈতিক নৈতিকতা কেবল তাদের বক্তৃতায় নয়, বরং তাদের নেতাদের ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক স্বচ্ছতার ওপর নির্ভর করে। ৫,৮৮৭ কোটি টাকার এই বিশাল অংকের খেলাপি ঋণ দেশের ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাতের ওপর যে মরণাঘাত হেনেছে, তার দায়ভার বিএনপি নেতৃত্ব কীভাবে এড়াবে?

​অনুসন্ধানী নজরে তাকালে দেখা যায়, এই তালিকার শীর্ষে থাকা চট্টগ্রামের আসলাম চৌধুরী একাই ১,৭০০ কোটি টাকার ঋণখেলাপি। শিপ ব্রেকিং ইন্ডাস্ট্রি এবং আবাসন খাতের উন্নয়নের দোহাই দিয়ে ব্যাংক থেকে যে অর্থ তিনি বের করে নিয়েছেন, তার বিপরীতে কার্যকর জামানত নিয়ে অনেক আগে থেকেই প্রশ্ন রয়েছে। 

একজন প্রভাবশালী নেতার এমন বিশাল অংকের ঋণ বছরের পর বছর অনাদায়ী থাকা প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংকগুলোকে জিম্মি করার সংস্কৃতি থেকে দলটি এখনো বেরিয়ে আসতে পারেনি। একইভাবে সিলেটের খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের ৮৪০ কোটি টাকা কিংবা বগুড়ার কাজী রফিকুল ইসলামের ৭৬৫ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকটকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যেখান থেকে সাধারণ গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।

​এই নেতাদের নামের তালিকাটি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি অশনিসংকেত। ফেণীর আবদুল আউয়াল মিন্টুর ২৯৪ কোটি, ভোলার হাফিজ ইব্রাহিমের ১০৯ কোটি কিংবা যশোরের টি এস আইয়ুবের ১৩৮ কোটি টাকার যে ঋণের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তা মূলত রাষ্ট্রের আর্থিক কাঠামোর ভেতরকার পচনকেই তুলে ধরে। যখন কোনো দল আগামীর রাষ্ট্রক্ষমতার স্বপ্ন দেখে, তখন তাদের নেতৃত্বের প্রথম কাজ হওয়া উচিত ছিল নিজেদের ঘর পরিষ্কার করা। কিন্তু তা না করে খেলাপি ঋণদাতাদের দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন রাখা এবং তাদের নেতৃত্বেই ‘দুর্নীতি বিরোধী’ স্লোগান দেওয়া জনগণের সাথে এক ধরণের নিষ্ঠুর তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়।

​ আমরা দেখি, সামান্য কয়েক হাজার টাকা কৃষি ঋণ শোধ করতে না পেরে প্রান্তিক কৃষকের ভিটেমাটি ক্রোক হচ্ছে, তাকে হাজতবাস করতে হচ্ছে। অথচ এই রাজনৈতিক মহারথীরা হাজার হাজার কোটি টাকা হজম করে দিব্যি রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে বড় বড় বুলি আওড়াচ্ছেন। এই যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং দ্বিমুখী আচরণ, এটাই বাংলাদেশের দুর্নীতির মূল উৎস। বিএনপি যদি সত্যিই দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়তে চায়, তবে তাদের এই ১৩ জনসহ সকল ঋণখেলাপি নেতার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। অন্যথায় তাদের 'জিরো টলারেন্স' নীতি কেবল একটি নির্বাচনী প্রোপাগান্ডা হিসেবেই বিবেচিত হবে।

​কুমিল্লার চিত্রটি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, শাহ মোফাজ্জল কায়কোবাদ থেকে শুরু করে রেদোয়ান আহমেদ বা আবুল কালাম—একাধিক নেতার ছোট-বড় ঋণের সমষ্টি একটি বিশাল অংকের বোঝা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে তা উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ না করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বা বিদেশে পাচার করার যে কালচার গড়ে উঠেছে, তা আমাদের অর্থনীতির রক্তক্ষরণ ত্বরান্বিত করছে। এই রক্তক্ষরণ বন্ধ না করে ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখা কেবল উচ্চাভিলাষই নয়, বরং হঠকারিতা।

​৫,৮৮৭ কোটি টাকার এই খেলাপি ঋণ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের করের টাকা এবং আমানতের টাকা। ব্যাংকিং খাতের এই সংকট যখন ঘনীভূত হয়, তখন দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি এবং মুদ্রাস্ফীতির মাধ্যমে তার মাশুল দিতে হয় সাধারণ জনগণকে। অর্থাৎ নেতাদের বিলাসিতা আর ব্যাংক লুটের খেসারত দিচ্ছে রিকশাচালক থেকে শুরু করে সাধারণ চাকুরিজীবী পর্যন্ত। এই বাস্তবতাকে আড়াল করে কোনো রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিই ধোপে টিকবে না।

​রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ মনে করেন, বিএনপি যদি তাদের 'দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ' গড়ার ঘোষণায় সৎ থাকতো, তবে এই তালিকায় নাম আসা নেতাদের বিরুদ্ধে তারা অনেক আগেই ব্যবস্থা নিত। কিন্তু তালিকার নেতাদের বর্তমান রাজনৈতিক সক্রিয়তা প্রমাণ করে যে, দলটির কাছে আর্থিক সততার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই মনোভাব বজায় রেখে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা কখনোই সম্ভব নয়। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় ব্যাংকগুলোকে 'বেল আউট' করা বা মূলধন যোগান দেওয়া আসলে চোরের মাকে সাহায্য করার শামিল।

​পরিশেষে আমরা বলতে চাই, বাংলাদেশের মানুষ আজ সচেতন। তারা কেবল মুখের কথা বা ইশতেহারের পাতা দেখে প্রলুব্ধ হতে চায় না। তারা চায় কর্মের প্রতিফলন। ৫,৮৮৭ কোটি টাকার এই পাহাড়সম ঋণখেলাপির বোঝা কাঁধে নিয়ে বিএনপি যখন দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার ডাক দেয়, তখন তা কেবল প্রশ্নের জন্ম দেয় না, বরং রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বকেই তুলে ধরে। সময় এসেছে রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরের এই আর্থিক দুর্বৃত্তদের চিহ্নিত করার। ব্যাংক লুটেরা এবং ঋণখেলাপিদের রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া বন্ধ না হলে দেশ কখনোই দুর্নীতির অভিশাপ থেকে মুক্ত হবে না।

​আমরা আশা করি, বিএনপি নেতৃত্ব এই বাস্তবতাকে উপলব্ধি করবে এবং তাদের আগামীর প্রতিশ্রুতিকে প্রশ্নাতীত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। অন্যথায়, ইতিহাসের পাতায় তারা কেবল প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের কারিগর হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইটা শুরু হওয়া উচিত নিজের ঘর থেকেই।

Leave Your Comments