আবু জাফর বিশ্বাস, বরিশাল ব্যুরোঃ বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী) আসনের নির্বাচনী মাঠে এবার দেখা মিলছে এক ব্যতিক্রমী মানবিক গল্পের। কারাগারের উঁচু দেয়ালের ভেতরে বন্দি বাবা, আর বাইরে গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে বাবার জন্য ভোট চাইছেন মেয়ে। এই আবেগঘন লড়াইয়ের কেন্দ্রে রয়েছেন জাতীয় পার্টির প্রার্থী ও তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম কিবরিয়া টিপু এবং তার মেয়ে হাবিবা কিবরিয়া।
বর্তমানে গোলাম কিবরিয়া টিপু ঢাকার কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি। তার অনুপস্থিতিতে পুরো নির্বাচনী প্রচারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন হাবিবা কিবরিয়া। প্রতিদিন বাবুগঞ্জ ও মুলাদীর বিভিন্ন এলাকায় উঠান বৈঠক, পথসভা ও গণসংযোগে অংশ নিচ্ছেন তিনি।
প্রচারে হাবিবা বলেন, এটি শুধু একটি রাজনৈতিক লড়াই নয়, এটি একজন মেয়ের বাবাকে ফিরিয়ে আনার সংগ্রাম। আমি বাবার পক্ষে নয়, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে মানুষের কাছে যাচ্ছি।
ঢাকায় নিজের সংসার, পাঁচ বছরের সন্তান ও শ্বশুর-শাশুড়িকে রেখে তিনি এখন পুরো সময় কাটাচ্ছেন নির্বাচনী এলাকায়। পরিবারের সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর গোলাম কিবরিয়া টিপুর বিরুদ্ধে ১০টি মামলা হয়। পরে মনোনয়ন দাখিলের পর আরও একটি মামলা হয়। সব মিলিয়ে তার বিরুদ্ধে বর্তমানে ১১টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ের সময় নাগরিকত্ব নিয়ে আপত্তি উঠলেও জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তার তদন্তে প্রমাণিত হয়, তার দ্বৈত নাগরিকত্ব নেই। ফলে প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করা হয়, যা কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে।
নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি ফৌজদারি মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে কমপক্ষে দুই বছর সাজাপ্রাপ্ত না হলে নির্বাচন করার সুযোগ থাকে। সে আইনগত সুযোগেই কারাগারে থেকেও নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন গোলাম কিবরিয়া টিপু।
হাবিবা কিবরিয়া বলেন, রাজনীতি যদি খেলায় পরিণত হয়, তবে সেই খেলার সবচেয়ে বড় শিকার আমার বাবা। মামলা, জামিন, আবার মামলা—এই চক্রের জবাব রাজপথে নয়, ভোটের মাধ্যমেই দিতে চাই।
বাবার অতীত কর্মকাণ্ডের কথাও তুলে ধরেন তিনি। তার ভাষায়, এমপি থাকাকালে বাবুগঞ্জ ও মুলাদীর অনেক হাটবাজারের খাজনা আমার বাবা নিজের অর্থ দিয়ে পরিশোধ করেছেন, যাতে সাধারণ মানুষ ইজারাদারদের হয়রানি থেকে মুক্ত থাকে। মানুষ এখনো সেই উন্নয়ন ভুলে যায়নি।
এক বছরের বেশি সময় ধরে বাবার কারাবন্দি থাকার প্রসঙ্গে হাবিবার কণ্ঠে ক্ষোভও ফুটে ওঠে। তিনি বলেন,
“একজন মানুষকে কারাগারে রাখা যায়, কিন্তু হাজার হাজার মানুষকে নয়। সরকার বাবাকে আটকে রাখতে পারে, কিন্তু জনগণ ভোটের মাধ্যমেই তার জবাব দেবে।”
কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি আহ্বান জানান, উত্তেজনা বা সংঘাতে না জড়িয়ে শান্তিপূর্ণভাবে প্রচার চালানোর। তার ভাষায়, এই লড়াইয়ে আবেগ নয়, ধৈর্য আর শান্ত থাকাই সবচেয়ে বড় কৌশল।
বরিশাল-৩ আসনে তাই এবার নির্বাচন শুধু প্রতীক বা দলের লড়াই নয়, অনেক ভোটারের কাছে এটি হয়ে উঠেছে একজন বাবার মুক্তির আশায় এক মেয়ের সংগ্রামের গল্প।