এস আই খান
নির্বাহী সম্পাদক, বার্তা বিচিত্রা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের পাতায় আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল একটি ভোট নয়, বরং এটি ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের এক মহাকাব্যিক রণকৌশল হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। দীর্ঘ আইনি ও রাজনৈতিক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী যখন তাদের নিবন্ধন ও নিজস্ব প্রতীক পুনরুদ্ধার করে নির্বাচনের ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছে, তখন তারা আর একক কোনো রাজনৈতিক শক্তি নয়; বরং তাদের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে এক শক্তিশালী নির্বাচনী মোর্চা। লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি) এবং জুলাই বিপ্লব পরবর্তী নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক শক্তি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র এই জোটে অবস্থান প্রমাণ করে যে জামায়াত এখন আর কেবল ধর্মীয় গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না বরং একটি জাতীয়তাবাদী ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মের নেতৃত্ব দিতে চায়। জামায়াতের নেতৃত্বে এই জোটে থাকা অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) এবং লেবার পার্টির সমন্বয়ে গঠিত এই ১০ দলীয় জোট এখন আর কেবল বিরোধী দল নয়, বরং তারা একটি ছায়া সরকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
এই নির্বাচনের সবচেয়ে চমকপ্রদ ও শক্তির উৎস হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বিশ্বের ৫টি মহাপরাশক্তি ও ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের নেপথ্য সমর্থন। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সহযোগী হিসেবে বিশ্বের মহাপরাশক্তি আমেরিকা, উদীয়মান জায়ান্ট চীন এবং তুরস্ক, পাকিস্তান ও মিশরের মতো ক্ষমতাধর মুসলিম রাষ্ট্রগুলো জামায়াত ও তাদের জোটের সাথে নিবিড় যোগাযোগ বজায় রাখছে। এটি কেবল কোনো রাজনৈতিক গুজব নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। আমেরিকা ও চীনের মতো দুটি বৈরী পরাশক্তি যখন কোনো একটি রাজনৈতিক জোটের সাথে একই সময়ে সংলাপে বসে, তখন বুঝতে হবে সেই জোটের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা এখন আর কেবল স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে জামায়াত নেতৃত্বের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা এবং চীনের রাষ্ট্রদূতের নিবিড় যোগাযোগ প্রমাণ করে যে, বিশ্বশক্তিগুলো আসন্ন নির্বাচনে এই ১০ দলীয় জোটকে একটি স্থিতিশীল ও দায়িত্বশীল পক্ষ হিসেবে গণ্য করছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের সরকার এবং পাকিস্তান ও মিশরের মতো রাষ্ট্রগুলোও এই জোটের প্রতি তাদের নৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থন ব্যক্ত করেছে, যা এই মোর্চাকে এক ধরনের আন্তর্জাতিক রক্ষাকবচ প্রদান করেছে।
এই ভূ-রাজনৈতিক সমর্থন যখন মাঠের রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়, তখন তা কেবল ভোটের অংক নয় বরং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। ১০ দলীয় এই জোটের শক্তিকে যারা অবমূল্যায়ন করছেন তারা হয়তো ভুলে গেছেন যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই সমর্থন কেবল আদর্শিক নয় বরং এটি বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সাথে জড়িত। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের ভোটারদের বিশাল একটি অংশ যারা আজ নির্বাচনের বাইরে থেকে দিকভ্রান্তের মতো ঘুরছে, তারা যখন দেখবে যে জামায়াত-নেতৃত্বাধীন এই জোট আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে রাষ্ট্রের হাল ধরতে প্রস্তুত, তখন তারা বিএনপিকে ভোট দেওয়ার বদলে এই জোটের দিকেই বেশি ঝুঁকবে। আওয়ামী লীগের সাথে বিএনপির যে ঐতিহাসিক শত্রুতা এবং গত ১৫ বছরের তিক্ত স্মৃতি মাথায় রেখে আওয়ামী লীগের ভোটাররা মনে করছে যে বিএনপি ক্ষমতায় আসলে তাদের ওপর রাজনৈতিক প্রতিশোধের মাত্রা বাড়বে। এমতাবস্থায় তারা জামায়াতের এই ১০ দলীয় জোটকেই তাদের জন্য কম ক্ষতিকারক বা একটি ভারসাম্যপূর্ণ সুরক্ষা কবচ হিসেবে বেছে নিতে পারে। মাঠ পর্যায়ের পর্যবেক্ষণ বলছে, অস্তিত্বের সংকটে থাকা আওয়ামী লীগের স্থানীয় অনেক নেতাকর্মী এবং নীরব সমর্থকরা এখন গোপনে জামায়াত বা এনসিপি-র প্রার্থীদের সাথে এক ধরণের 'নিরাপত্তা সমঝোতা'র পথ খুঁজছে।
কর্নেল (অব.) অলি আহমদের মতো একজন বর্ষীয়ান মুক্তিযোদ্ধার উপস্থিতি যেমন জাতীয়তাবাদীদের আশ্বস্ত করছে, তেমনি এনসিপি-র তারুণ্য জুলাই বিপ্লবের স্পিরিটকে ধারণ করছে, যার ফলে আওয়ামী লীগের ভোটাররা একে একটি নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বিকল্প হিসেবে দেখছে। জামায়াত নেতাদের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি আকস্মিক সহমর্মিতা প্রদর্শনকে অনেকেই কেবল নির্বাচনী চাল মনে করলেও, এটি আসলে তাদের বিশ্বজনীন রাজনৈতিক সংস্কারের একটি অংশ।
আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্ব যখন দেখে যে একটি ইসলামী দল মণ্ডপে গিয়ে অসাম্প্রদায়িকতার বার্তা দিচ্ছে, তখন তাদের প্রতি বৈশ্বিক সমর্থন আরও জোরালো হয়। এই ভূ-রাজনৈতিক চালের ফলে আওয়ামী লীগের যে 'অসাম্প্রদায়িক' তকমা ছিল, তা কৌশলগতভাবে এই জোটের অনুকূলে চলে আসছে। ১২ই ফেব্রুয়ারি নির্বাচনটি তাই কেবল সরকার গঠনের জন্য নয় বরং এটি আওয়ামী লীগ পরবর্তী রাজনৈতিক শূন্যতা কে পূরণ করবে এবং বিএনপিকে পাশ কাটিয়ে জামায়াত কি কিংমেকার হিসেবে আবির্ভূত হবে তার চূড়ান্ত পরীক্ষা।
পাকিস্তান, তুরস্ক ও মিশরের মতো দেশগুলোর সাথে ঐতিহাসিক ও আদর্শিক সুসম্পর্ক এবং চীন ও আমেরিকার সাথে আধুনিক বাণিজ্যিক সমঝোতা এই জোটকে এক অপরাজেয় শক্তিতে পরিণত করেছে। ১০ দলীয় এই জোটের প্রতিটি শরিক দলের রয়েছে নিজস্ব ক্যাডারভিত্তিক কর্মী বাহিনী যারা ভোটের দিন কেন্দ্র দখলে বা ভোটার উপস্থিতিতে বড় প্রভাব ফেলতে সক্ষম। যদি এই জোট প্রতিটি আসনে একক প্রার্থী বা 'ওয়ান-বক্স পলিসি' নিশ্চিত করতে পারে, তবে ব্যালটের যুদ্ধে বিএনপির জন্য জয় পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। আওয়ামী লীগের নীরব ভোটাররা যদি শেষ মুহূর্তে এই জোটের দিকে হেলে পড়ে তবে তা হবে বিএনপির জন্য এক রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি আর ১০ দলীয় এই জোটের জন্য এক মহা-উত্থান।
পরিশেষে বলা যায়, ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াত ও তাদের ১০ দলীয় জোটের অবস্থানই বলে দেবে বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাচ্ছে। ক্ষমতার লোভে বা অস্তিত্ব রক্ষায় যখন ভিন্ন ভিন্ন আদর্শের দলগুলো এক হয় এবং তাদের পেছনে বিশ্বের পরাশক্তি রাষ্ট্রগুলোর সমর্থন থাকে, তখন তা মাঠের রাজনীতিতে এক বিশাল মহাপ্রলয় তৈরি করে। এই ভূ-রাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ শক্তির মেলবন্ধন যদি ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে প্রতিফলিত হয়, তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা হতে পারে।