এস আই খান
গত ১৭ই অক্টোবর আওয়ামীলীগ সমর্থিত প্রার্থীর অভূতপূর্ব পরাজয়ের মাধ্যমে শেষ হলো নরসিংদী জেলা পরিষদ নির্বাচন। দলীয় সমর্থিত প্রার্থীর এ লজ্জাজনক পরাজয়ের জন্য জেলার রাজনৈতিক বিশ্লষকরা অনেকগুলো কারন রয়েছে বলে মনে করছেন।
প্রথমত, ২০১৭ সালের জেলা পরিষদ নির্বাচনে মতিন ভূইয়া আওয়ামীলীগের বিদ্রোহী হিসেবে এড. আসাদুজ্জামান খানের সাথে পরাজিত হয়। কিন্তু নির্বাচিত হবার মাস খানেক পর এড. আসাদুজ্জামান খানের মৃত্যু হলে মতিন ভূইয়া চেয়ারম্যান ও জেলা পরিষদের প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেন। তবে এ দায়িত্ব পালনকালে তিনি কমিশন ছাড়া কোনো কাজ না করার অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া মতিন ভূইয়ার ক্ষমতা থাকাকালীন জেলা পরিষদের সকল প্রকল্পের কাজ সর্বনিম্ন ১০% কমিশনের মাধ্যমে জেলা পরিষদের সদস্যদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করত। কাজ দেওয়া হতো না কোনো ঠিকাদারকে। জেলা পরিষদ সদস্যরাও ইচ্ছে মত মসজিদ, মাদ্রাসা, রাস্তা, বাউন্ডারিসহ সকল কাজ কোনো টিকাদারকে না দিয়ে নিজেরা ঠিকাদার হয়ে ৪০-৫০% কাজ করতো বাকী টাকা আত্মসাৎ করতো বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। এতে করে স্থানীয় ইউপি সদস্য ও চেয়ারম্যানদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
দ্বিতীয়ত, নরসিংদী-৪ এর বেলাব-মনোহরদী সংসদীয় আসনের সাংসদ শিল্পমন্ত্রনালয়ের মাননীয় মন্ত্রী এড. নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন এমপি এর রাজনৈতিক ব্যর্থতার কারনেই মন্ত্রীর দুই উপজেলা (বেলাব-মনোহরদী) তে জেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগ সমর্থিত জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মতিন ভূইয়া ফেল করেছেন বলে দাবী রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। মন্ত্রীর ব্যর্থততার দায় তার সমর্থিত প্রার্থীর উপরই বর্তানো হয়েছে বলে মনে করছেন তারা। তাছাড়া গত ২১ই আগস্ট মন্ত্রী তার নিজ বাসভবনে দুই উপজেলার সকল ইউপি সদস্য ও চেয়ারম্যানদের নিয়ে শোক দিবস পালন করেন। কিন্তু শোক দিবস পালনের পরই মন্ত্রী ঘোষণা দেন সবার জন্য প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে একটি উপহার রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া উপহারের কথা বলে সকল ইউপি সদস্য ও চেয়ারম্যানদের ১০ কেজি চাল, ১ কেজি তেল, ১ কেজি আটা, ১ কেজি চিনি, ১ কেজি ডাল ও ১ কেজি লবন দিয়ে একটি ত্রানের প্যাকেট হাতে ধরিয়ে দেন। এতে উপস্থিত সকলের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। কিছু চেয়ারম্যান ও সদস্য তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া জানালেও কোনো লাভ হয় নি। তাছাড়া ২০১৮ সালে নির্বাচনে জয় লাভ করার পর মন্ত্রীত্বের দায়িত্ব পাবার বেলাব ও মনোহরদীতে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্য ফাটল তৈরি করে রেখেছেন। বেলাবতে দলীয় কার্যক্রম নাই বললেই চলে। এমনকি দলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীও পালন করা হয় নি। এ নিয়ে নেতাকর্মীর মধ্যে রয়েছে ক্ষোভ। এ নির্বাচনে সেই ক্ষোভেরই বিহঃপ্রকাশ হয়েছে। তাই বেলাবতে ১০৭ টি ভোটের মধ্যে দল সমর্থিত মতিন ভুইয়া কাপ পিরিচ মার্কা নিয়ে মাত্র ৪৩টি ভোট পেয়েছে যেখানে তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মনির হোসেন ভূইয়া ৬১ টি ভোট পায়। মনোহরদী উপজেলা তথা মন্ত্রীর বাড়ি থেকে কাপ পিরিচ ভোট পেয়েছে ৫৪টি এবং বিদ্রোহী প্রার্থী মনির হোসেন ভূইয়া ভোট পেয়েছে ১১০টি। উল্লেখ্য যে মনির হোসেন ভূইয়াকে উপজেলার অনেক ভোটার না দেখেও ভোট দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।
তৃতীয়ত, গত ১৭ই সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয়েছিল জেলা আওয়ামীলীগের কাউন্সিল। সেখানে রয়েছে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে দল বহিঃভূত ব্যক্তিকে সভাপতি ও প্রার্থী বহিঃভূত ব্যক্তিকে সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করায় জেলার প্রবীন ও ত্যাগী আওয়ামী লীগ নেতাদের তৈরি হয় গভীর ক্ষোভ। আর তারই ফল প্রকাশিত হয় এই জেলা পরিষদ নির্বাচনে। জেলার সকল নেতা মুখে মুখে মতিন ভূইয়াকে সমর্থন করলেও গোপনে কাজ করেছে বিদ্রোহী প্রার্থী মনির হোসেন ভূইয়ার পক্ষে। তাছাড়া জেলা কাউন্সিলে জেলার প্রবীন নেতা কর্মীকে নিয়ে কুটুক্তি ও আক্রমত্মক বক্তব্য একটি অঘোষিত ক্ষোভের তৈরি করেছিল। জেলা সভাপতি প্রার্থী ছিলো ২ জন। তবে সভাপতি হিসেবে ঘোষিত জিএম তালেব ছিলেন জাতীয় পার্টি থেকে আগত। তথাপি সাধারন সম্পাদক প্রার্থী ছিলেন ১৮জন। কিন্তু পীরজাদা মোহাম্মদ আলী সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী না হয়েও সাধারণ সম্পাদক ঘোষিত হয় কিভাবে? এ প্রশ্নের কোনো উত্তর এখনও পায়নি জেলার ত্যাগী নেতারা। তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এ জেলা পরিষদের নির্বাচনের মাধ্যমে।
তাইতো জেলার ৬টি উপজেলার কোনো উপজেলা থেকে আওয়ামীলীগ সমর্থিত কাপ পিরিচ মার্কা পাশ করতে পারেনি। ১০০৩ ভোটের মধ্যে মতিন ভূইয়া মাত্র ৩৫০ভোট ও বিদ্রোহী প্রার্থী মনির হোসেন ভূইয়া ৬২২ ভোট পেয়ে বেসরকারীভাবে বিজয়ী হয়।
তাই আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে শক্তশালী ও সুঘটিত আওয়ামীলীগকে পূর্বের মত সুঘটিত করতে প্রয়োজন যোগ্য নেতৃত্ব ও একজন দক্ষ সমন্বয়ক বলে মনে করছেন রাজনৈতিক মহল।