ইরাকের মরুভূমিতে মাসের পর মাস ছিল ইসরায়েলের গোপন ঘাঁটি, কীভাবে ফাঁস হলো সেই খবর

Date: 2026-05-19
news-banner

ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলীয় মরুভূমিতে ইসরায়েলের গোপন সামরিক ঘাঁটির অস্তিত্ব নিয়ে নতুন করে তীব্র বিতর্ক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এক স্থানীয় মেষপালকের রহস্যজনক হত্যাকাণ্ডের পর সামনে আসে চাঞ্চল্যকর এই তথ্য। অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েল ইরাকের ভেতরে গোপনে সামরিক ঘাঁটি পরিচালনা করছিল এবং সেখান থেকে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হতো।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম The New York Times–এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, গত ৩ মার্চ ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলের মরুভূমিতে দুর্ঘটনাবশত একটি গোপন ঘাঁটির কাছাকাছি পৌঁছে যান ২৯ বছর বয়সী মেষপালক আওয়াদ আল-শাম্মারি। এরপর একটি হেলিকপ্টার তাঁর পিকআপ ট্রাক ধাওয়া করে গুলি চালায়। পরে আগুনে পুড়ে যায় গাড়িটি এবং নিহত হন আওয়াদ।

যেভাবে সামনে আসে গোপন ঘাঁটির তথ্য

স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আওয়াদ আল-শাম্মারি বাজারে যাওয়ার পথে মরুভূমির একটি এলাকায় অস্বাভাবিক সামরিক তৎপরতা দেখতে পান। সেখানে একটি রানওয়ে, সামরিক তাঁবু, হেলিকপ্টার ও সশস্ত্র সেনাদের উপস্থিতি ছিল।

ঘটনার আগে তিনি স্থানীয় সামরিক কর্তৃপক্ষকে ফোন করে বিষয়টি জানান বলেও দাবি করেছেন তাঁর স্বজনেরা। এরপর তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

দুই দিন পর পরিবার ঘটনাস্থলে গিয়ে একটি পোড়া পিকআপ ও দগ্ধ মরদেহ খুঁজে পায়। আওয়াদের চাচাতো ভাই আমির আল-শাম্মারি বলেন, তাঁদের বিশ্বাস শুধুমাত্র ওই গোপন ঘাঁটির কাছাকাছি চলে যাওয়ার কারণেই আওয়াদকে হত্যা করা হয়েছে।

ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানে ব্যবহৃত হতো ঘাঁটি

জ্যেষ্ঠ ইরাকি ও আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের দাবি, ইসরায়েল ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকেই ইরাকের প্রত্যন্ত মরুভূমিতে অস্থায়ী সামরিক ঘাঁটি তৈরি শুরু করে। এসব ঘাঁটি মূলত ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনার সহায়ক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

কর্মকর্তাদের মতে, ২০২৫ সালের জুনে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিনের সংঘাতে এই ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করা হয়েছিল। সেখানে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানকে জ্বালানি সরবরাহ, চিকিৎসা সহায়তা এবং অভিযানের লজিস্টিক সাপোর্ট দেওয়া হতো।

এর আগে The Wall Street Journal ইরাকের ভেতরে ইসরায়েলের একটি সামরিক ফাঁড়ির খবর প্রকাশ করেছিল। তবে এখন জানা যাচ্ছে, পশ্চিমাঞ্চলীয় মরুভূমিতে অন্তত দুটি গোপন ঘাঁটি ছিল।

যুক্তরাষ্ট্র জানত, কিন্তু ইরাককে জানায়নি?

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তত একটি ঘাঁটির বিষয়ে ওয়াশিংটন আগে থেকেই জানত। কিন্তু ইরাক সরকারকে সে তথ্য জানানো হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

আঞ্চলিক নিরাপত্তা কর্মকর্তারা মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক সমন্বয় এতটাই ঘনিষ্ঠ যে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড এসব ঘাঁটির বিষয়ে কিছুই জানত না—এমনটা বিশ্বাস করা কঠিন।

ইরাকের পার্লামেন্ট সদস্য ওয়াদ আল-কাদু বলেন, “এটি ইরাকের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের মর্যাদার প্রতি প্রকাশ্য অবজ্ঞা।”

ইরাকি বাহিনীর ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে

ঘটনার পর ইরাকের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। কারণ, মরুভূমির এক মেষপালক যেখানে গোপন সামরিক স্থাপনার অস্তিত্ব টের পেয়েছেন, সেখানে ইরাকি বাহিনী কীভাবে এতদিন তা জানতে পারেনি—সেই প্রশ্ন উঠেছে।

আলী আল-হামদানি বলেন, তাঁদের বাহিনী কয়েক সপ্তাহ ধরেই ওই এলাকায় সন্দেহজনক সামরিক তৎপরতার খবর পাচ্ছিল। তবে সরাসরি অভিযান না চালিয়ে দূর থেকে নজরদারি করা হচ্ছিল।

পরে ইরাকি সেনাবাহিনীর একটি দল ঘটনাস্থলের কাছে গেলে তারা গোলাগুলির মুখে পড়ে। এতে একজন সেনা নিহত ও দুজন আহত হন বলে জানানো হয়।

ইসরায়েলের নীরবতা

এ ঘটনায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর কাছে একাধিকবার মন্তব্য চাওয়া হলেও তারা কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। অন্যদিকে, ইরাক সরকারও এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের ভূখণ্ডে ইসরায়েলি ঘাঁটির অস্তিত্ব স্বীকার করেনি।

কারণ, ইসরায়েলের সঙ্গে ইরাকের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই এবং দেশটির জনগণের বড় অংশ ইসরায়েলকে শত্রু রাষ্ট্র হিসেবে দেখে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা শুধু একটি গোপন সামরিক ঘাঁটির তথ্য ফাঁসের বিষয় নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ভূরাজনীতি, ইরান-ইসরায়েল দ্বন্দ্ব এবং ইরাকের সার্বভৌমত্ব সংকটকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

Leave Your Comments