ফারুকদের পেটে কী পরিমান গ্যাস আটে!

Date: 2022-10-30
news-banner



আব্দুল্লাহ আল মামুন (ঢাকা ব্যুরো প্রধান):  “ফারুকদের পেটে কী পরিমান গ্যাস আটে” বাক্যটি প্রতীকী অর্থে ব্যবহার করা হলেও দেশে তিতাস কর্তৃক উৎপাদিত সরকারি মূল্যবান সম্পদ ‘জ্বলানী গ্যাস’ ফারুকদের মত চোরেরা কী পরিমান চুরি করতে পারে তার যেন কোন ইয়ত্তা নেই। আর বৈধ সংযোগ নিয়ে প্রতি মাসে নির্ধারিত হারে বিল পরিশোধ করেও বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে ভোর হতে মধ্যরাত পর্যন্ত গ্যাসের দেখা না পেয়ে গ্রাহকদের অভিযোগেরও শেষ নেই। এ যেন এক গ্যাস চোরদের রাজ্যের গল্প। 
চলতি বছরের ১০ মে রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর এলাকায় তিতাস গ্যাস কোম্পানী লিমিটেড গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছিল। কারন হিসেবে তাদের বক্তব্য ছিল, ওই এলাকায় বৈধ গ্রাহক রয়েছে ১২ হাজার। অথচ লক্ষাধিক গ্রাহক গ্যস সংযোগ ব্যবহার করছেন। অর্থাৎ প্রায় ৯০ হাজার গ্রাহক অবৈধভাবে সংযোগ নিয়েছেন। এছাড়া বৈধ গ্রাহকদের কাছেও বড় অংকের বিল, প্রায় ৬৭ কোটি টাকা বকেয়া পড়ে আছে। এতে সরকারের বড় ধরনের ক্ষতি সাধন হচ্ছে। এসব দিক বিবেচনা করে তিতাস গ্যাস কোম্পানী ঐ সময় কামরাঙ্গীরচর এলাকায় তাদের সকল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এতে করে হাজার হাজার বৈধ সংযোগধারীরা চরম ভোগান্তিতে পড়ে যায়। এ সময় চর এলাকার অধিকাংশ নিম্ন আয়ের মানুষদের ভোগান্তির সীমা ছিল না। গ্যাস না থাকায় কেরোসিন ও লাকড়ির চুলাই ছিল ভরসা। কিন্ত ঐ সময় কেরোসিন ও লাকড়ির দামও তরতর করে বেড়ে যায়। খাবার হোটেলগুলোতে ১০ টাকার ভাত ২০ টাকা হয়ে যায়। নিম্ন আয়ের মানুষেরা দু’বেলা দু’মুঠো ভাতের জন্য উনুনে আগুন জালাতে গিয়ে সঞ্চিত টাকা ভেঙ্গে অনেকেই ধার-দেনায় পড়ে যায়। কিন্তু যাদের কারেন সাধারন মানুষদের এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল তাদের যেন কিছুই হয় না। তারা যেন সব সময়ই ধরা-ছোঁয়ার বাইরে রয়ে যায়। 
এক সময় তিতাস গ্যাস কোম্পানী লিমিটেড স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সাথে ও গ্রাহকদের সাথে কয়েকদফা আলোচনা-বৈঠক শেষে যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে বৈধ গ্রাহকদের পুনঃসংযোগ দেয়া শুরু করে। আর তখনই আবারো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে তিতাসের এই সরকারি সম্পদ লুটেপুটে খাওয়া রাঘব বোয়ালেরা। এদেরই একজন মো. ফারুক। জানা যায়, কামরাঙ্গীরচরের হাসান নগরে ফারুকের রয়েছে অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেয়া ডোলা (কিচেন র‌্যাক) বানানোর বিশাল কারখানা। কারখানাটির অবস্থান ঝাউলাহাটি-হাসান নগর প্রধান সড়ক থেকে এক প্লট ভিতরে। বড় গেইট ওয়ালা তিন দিকে দেয়াল ঘেরা প্রথম প্লটটি লামিয়া রেন্ট-এ-কার নামে পরিচিত হলেও এটি মূলত গাড়ি রাখার পাকিং হিসেবে ভাড়া দেয়া হয়েছে। এখান থেকে ভাড়ায় গাড়ি পাওয়া যায়। গাড়ি রাখার বিশাল এই জায়গাটি ফারুকের অবৈধ ডোলা কারখানাটিকে বেশ আড়াল করে রেখেছে। শরীয়তপুর জেলার জাজিরা থানা এলাকার এই ফারুক কামরাঙ্গীরচরে ভাড়া বাসায় থাকেন এবং ডোলা বানানো কারখানার বিশাল জায়গাটিও তার ভাড়া নেয়া। সরেজমিন কারখানাটি পরিদর্শনে গেলে দেখা যায় যে, সেখানে ডোলা বানানোর বিভিন্ন উপাদান যেমন বান্ডেল বান্ডেল এমএস স্কয়ার বার, এমএস নেট, ফ্রেম, বিভিন্ন মেশিনারিজ এবং বিশাল আকারের ২ টি চেম্বার রয়েছে। এই চেম্বারই মূলত ডোলা কারখানার প্রাণ। এর ভিতরেই যত কম সময়ে পারা যায়, মেশিনের সাহায্যে টেনে প্রচুর পরিমানে গ্যাস সরবরাহ করে তীব্র আগুনে ডোলার বিভিন্ন অংশকে পুড়িয়ে লাল বর্ণ ধারন করলে তা প্লাষ্টিক মিশ্রিত শুকনো গুড়ো রঙের স্তুপে ডুবিয়ে তোলা হয়। আর মুহূর্তেই সেই রং মসৃন হয়ে তাতে লেগে যায়। সেখানে কথা হয় কর্মচারী পরিচয় দেয়া মো. ইসমাইল, শাকিল, ইমাম হেসেন ও রাসেলসহ বেশ কয়েকজনের সাথে। তারা কারখানা ও অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিষয়ে মুখ খুলতে রাজি নয়। প্রায় সকলেই জানায়, তারা ১০/১২ দিন হয় এখানে কাজে লেগেছে, তাই বেশী কিছু জানে না। কারখানা মালিক ফারুককে খুঁজে পাওয়া যায়নি, তবে তাদের কাছ থেকে ফারুকের মুঠোফোন নম্বর পাওয়া যায়। 
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কারখানার আশেপাশের এক বাসিন্দা জানান, কারখানাটিতে রাত ১০ টার পর থেকে সকাল ৮ টা পর্যন্ত টানা কাজ চলে। এ সময় তীব্র গ্যাসের আগুনে এমএস বার ও প্লাষ্টিক মিশ্রিত রং পোড়ানো গন্ধে এলাকার বাতাস দুষিত হয়। এলাকাবাসির ঘুমের সমস্যা হয় এবং সকালবেলা বাসা-বাড়িতে গ্যাস থাকে না। তিনি আরও জানান, মাসখানেক আগে তিতাস কোম্পানী থেকে লোকজন এসে ফারুকের কারখানার অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। কিন্তু আবারো সে এলাকার নেতৃস্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সহযোগীতায় গ্যাসের সংযোগ লাগিয়ে পুরোদমে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এতে করে সাধারন মানুষ এই অবৈধ কাজের প্রতিবাদ করারও সাহস পাচ্ছে না। 
প্রতিবেদনটি তৈরীর আগে ফারুকের সাথে মুঠোফোনে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। এক প্রশ্নের জবাবে ফারুক জানায়, কামরাঙ্গীরচরে ২০ বছর যাবত এই ব্যবসা চলছে। সে জড়িত আছে ৬/৭ বছর যাবত। ফারুকের ভাষায় কামরাঙ্গীরচর এলাকায় এক/ দুই’শ এ ধরনের কারখানা রয়েছে। যার সবগুলো এভাবেই (অবৈধ) চলছে। প্রতিদিনই পুলিশ ও তিতাশসহ বিভিন্ন সংস্থার লোকজন আসছে, তাদেরকে ম্যানেজ করেই চলতে হয় বলে জানায় সে।

Leave Your Comments