নিয়ম-নীতি ও জ্যেষ্ঠতার তোয়াক্কা না করে কীভাবে এক রাতের ব্যবধানে প্রশাসনের চরম প্রভাবশালী চেয়ার বাগিয়ে নেওয়া যায়—তারই এক নিখুঁত মহড়া যেন দেখা গেছে কুমিল্লার সাবেক জেলা প্রশাসক (ডিসি) খন্দকার মু. মুশফিকুর রহমানের পদায়নে! আমলাতন্ত্রের অদৃশ্য সুতা টেনে এবং ক্ষমতার প্রভাবশালী বলয়কে কাজে লাগিয়ে কীভাবে এই কর্মকর্তা একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করেছেন, তা নিয়ে প্রশাসনে এখন মুখরোচক আলোচনা। যোগ্যতা ও প্রশাসনিক চাহিদাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রাতারাতি তাকে কুমিল্লার মতো কৌশলগতভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি জেলার মসনদে বসানো নিয়ে উঠেছে তীব্র ক্ষোভ ও নানা প্রশ্ন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালনের পুরস্কারস্বরূপ ২০২৩ সালের জুলাইয়ে তাকে সরাসরি দেওয়া হয় কুমিল্লার ডিসির চেয়ার। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন ও দায়িত্ব গ্রহণের সময়কাল বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়—কোনো এক 'অদৃশ্য জাদুমন্ত্রে' রাতারাতি কপাল খুলে যায় এই কর্মকর্তার। কিন্তু প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্রে থাকা একজন পিএস কীভাবে জ্যেষ্ঠ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের ডিঙিয়ে এমন একটি হেভিওয়েট জেলার প্রধান হলেন? এর পেছনে কি শুধুই তোষামোদ আর দলীয় চাটুকারিতার প্রতিযোগিতা ছিল, নাকি ছিল আর্থিক ও রাজনৈতিক কোনো গভীর লেনদেন?
২৭তম বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের এই কর্মকর্তা কুমিল্লার মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও বড় জেলার দায়িত্ব পেয়েছিলেন কোন মন্ত্রে? আমরা জানি, একজন ডিসির হাতে থাকে একক প্রশাসনিক ক্ষমতা—ভূমি ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন বাজেট, নির্বাচনের নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে বিরাট অংকের সরকারি ত্রাণ তহবিলের দেখভাল।
ফিটনেস তালিকায় থাকা শত শত সৎ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে পেছনে ফেলে তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পেছনের কলকাঠি নেড়েছিল কারা?
প্রচলিত প্রশাসনিক বিধিমালা ও পদায়ন নীতিমালার বুকে কোন ছুরিকাঘাতে এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল?
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের লাল ফিতার পেটে জমা পড়া পদায়নসংক্রান্ত গোপন নথি প্রকাশ পেলেই বেরিয়ে আসবে—ক্ষমতার সিঁড়ি বেয়ে এই কর্মকর্তার ওপরে ওঠার পেছনে তৎকালীন কোন সিন্ডিকেট কাজ করেছিল।
ক্ষমতার অলিন্দে 'নেটওয়ার্ক' ও প্রভাব খাটানোর মহোৎসব।
প্রকাশিত নানা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বারবার উঠে এসেছে তার প্রভাবশালী সামাজিক ও পারিবারিক বলয়ের কথা। আমলাতান্ত্রিক সুবিধা নিতে এই বলয়কে তিনি কীভাবে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন, তা এখন ওপেন সিক্রেট। প্রশাসনিক পদায়নে নিয়মকানুন শিকেয় তুলে অনৈতিক সুপারিশের যে চর্চা তিনি চালিয়ে গেছেন, তার হিসাব মেলানো জরুরি।
প্রশ্ন উঠেছে, তার বিরুদ্ধে ওঠা ক্ষমতার অপব্যবহার ও নিয়মবহির্ভূত প্রভাব খাটানোর এই অভিযোগগুলো কি শুধুই গুঞ্জন? নাকি এর পেছনে রয়েছে শক্ত কোনো সিন্ডিকেটের মদদ? সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তার পদায়ন সংক্রান্ত সমস্ত সুপারিশপত্র ও ফাইল জনসমক্ষে আনা এখন সময়ের দাবি।
কুমিল্লার ডিসি পদে থাকার সময় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ বরাদ্দের বিশাল অংকের বাজেট তদারকির দায়িত্বে ছিলেন খন্দকার মুশফিকুর রহমান। আর সেখানেই উঠেছে দুর্নীতির এক বিরাট গন্ধ! দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষের পেটে লাথি মেরে সেই সরকারি বরাদ্দের সুফল কারা ভোগ করেছিল?
অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি এবং সুবিধাবাদীদের মধ্যে ত্রাণ ও পুনর্বাসনের টাকা বাঁটোয়ারার যেসব অভিযোগ উঠেছে, তার সত্যতা মেলাতে দরকার কঠোর অডিট। ভুয়া সুবিধাভোগীদের তালিকা, লোকদেখানো বিতরণ প্রতিবেদন এবং বরাদ্দের খাতসংক্রান্ত নথিপত্র স্রেফ নিরপেক্ষ অডিট করলেই থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে। আড়ালে থেকে কার পকেটে ঢুকেছে এসব সরকারি অর্থ, তা বের করা এখন জনদাবি।
২৪-এর প্রহসনের নির্বাচন ও জুলাইয়ের রক্তক্ষরণ: তার ভূমিকা কী ছিল?
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির 'একতরফা' ও প্রহসনের জাতীয় নির্বাচনে কুমিল্লায় রিটার্নিং কর্মকর্তা ও মূল প্রশাসনিক চালিকাশক্তি হিসেবে তার ভূমিকা ছিল চরম বিতর্কিত। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার তক্তা ঠিক রাখতে নিরপেক্ষতার সব সীমা লঙ্ঘন করেছিলেন তিনি।
সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের দিনগুলোতে। কুমিল্লায় যখন আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানো হচ্ছিল, তখন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে তিনি কার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছিলেন? গণঅভ্যুত্থান দমনে তৎকালীন সরকারি নির্দেশনা কীভাবে পালিত হয়েছিল এবং তার হুকুমেই বা কী ঘটেছিল, তা নিয়ে সিআরপিসি ও বিভাগীয় নথির ভিত্তিতে অবিলম্বে বিচারিক তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
খন্দকার মুশফিকুর রহমানের এই অবিশ্বাস্য ও বিতর্কিত পদায়নের পিছনের আসল সত্য জানতে হলে পদায়ন প্রক্রিয়ার ফাইল জনসমক্ষে আনা ছাড়া বিকল্প নেই। তিনি কতটা যোগ্য ছিলেন, আর কতটা তোষামোদ কিংবা প্রভাব খাটিয়ে পদ বাগিয়েছিলেন—তার উত্তর জমা আছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওই বন্ধ নথিতেই।
খন্দকার মুশফিকুর রহমানের বক্তব্যের জন্য তার মুঠোফোনে বার বার চেষ্টা করার পরও ফোন রিসিভ না করায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয় নাই।