রাজনীতির প্রকৃত শক্তি কোথায়? ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা নেতাদের হাতে, নাকি রাজপথে ঘাম ঝরানো সাধারণ কর্মীদের হাতে? প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, একটি রাজনৈতিক দলের ভিত্তি তৈরি হয় তৃণমূলের কর্মী ও সমর্থকদের শ্রম, ত্যাগ, সাহস এবং সাংগঠনিক নিষ্ঠার ওপর। অথচ রাজনীতির দীর্ঘ পথপরিক্রমায় সবচেয়ে বেশি অবহেলা ও অবমূল্যায়নের শিকার হন এই কর্মীরাই। দলের দুঃসময়ে যাঁদের ছাড়া রাজপথে দাঁড়ানো কঠিন, সুসময়ে তাঁরাই গুরুত্বহীন হয়ে পড়েন।
রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে এই বৈপরীত্য চোখে পড়ে। রাজনৈতিক আদর্শ ও নেতৃত্বের আহ্বান সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া, মিছিল, সমাবেশ ও আন্দোলনে অংশ নেওয়া, সাংগঠনিক কার্যক্রম সচল রাখা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দলের পাশে দাঁড়ানোর প্রধান দায়িত্ব পালন করেন তৃণমূলের কর্মীরা। তাঁদের অধিকাংশই নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। সীমিত আয়, সংসারের চাপ এবং নানা সামাজিক বাস্তবতা উপেক্ষা করে তাঁরা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সময় দেন। অনেকের পায়ে থাকে পুরোনো স্যান্ডেল, পকেটে থাকে যাতায়াতের সামান্য খরচ, কিন্তু মনে থাকে দলীয় আদর্শ ও নেতৃত্বের প্রতি গভীর প্রত্যাশা।
রাজনীতির সবচেয়ে কঠিন সময়েই তৃণমূল কর্মীদের প্রকৃত ভূমিকা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যখন কোনো দল ক্ষমতার বাইরে থাকে, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা বাড়ে, তখন মাঠপর্যায়ের কর্মীরাই সংগঠনকে টিকিয়ে রাখার প্রধান শক্তি হয়ে উঠেন। মামলা, হামলা, গ্রেফতার, হয়রানি, ভয়ভীতি কিংবা সামাজিক চাপের মুখেও অনেকে সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেন। কখনো কর্মহীনতা, কখনো আর্থিক সংকট, আবার কখনো পারিবারিক অশান্তির মধ্যেও তাঁরা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকেন। অথচ তাঁদের এই ত্যাগের যথাযথ স্বীকৃতি কতটুকু মেলে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
রাজনীতির একটি নির্মম বাস্তবতা হলো, দুঃসময়ে তৃণমূল কর্মীদের গুরুত্ব বাড়ে, কিন্তু সুসময় ফিরে এলে অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের অবস্থান সংকুচিত হয়ে যায়। দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত কর্মীকে পাশ কাটিয়ে হঠাৎ পরিচিতি পাওয়া ব্যক্তি, অর্থবিত্তের মালিক কিংবা প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠজন গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করেন। কমিটি গঠন, নেতৃত্ব নির্বাচন, সাংগঠনিক পদ বণ্টন কিংবা বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে ত্যাগী কর্মীদের পরিবর্তে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও প্রভাব অনেক সময় প্রাধান্য পায়। ফলে দীর্ঘদিন রাজপথে থাকা কর্মীদের মনে জন্ম নেয় হতাশা, ক্ষোভ ও বঞ্চনার অনুভূতি।
আরও দুঃখজনক হলো, অনেক কর্মী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকলেও তাঁদের পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা কিংবা ব্যক্তিগত সংকটের সময় পাশে দাঁড়ানোর মতো কাউকে পাওয়া যায় না। অথচ তাঁদের ত্যাগের গল্প রাজনৈতিক সভা, মঞ্চ ও বক্তৃতায় বারবার উচ্চারিত হয়। বাস্তব জীবনে সেই ত্যাগের স্বীকৃতি কতটা কার্যকর হয়, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ত্যাগের মূল্যায়ন কি শুধু বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ থাকবে? একটি রাজনৈতিক দল শুধু কয়েকজন নেতার সিদ্ধান্তে দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না। দলের শক্তি নির্ভর করে তৃণমূলের সঙ্গে নেতৃত্বের সম্পর্ক, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং কর্মীদের প্রতি আস্থার ওপর। যে কর্মী প্রতিকূল সময়ে দলের পতাকা বহন করে, তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক অবদানকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে নতুনদের জন্য সুযোগ তৈরি করতে গিয়ে পুরোনো ও পরীক্ষিত কর্মীদের অবদান অস্বীকার করাও কোনোভাবেই কাম্য নয়।
রাজনীতিতে নেতৃত্বের পরিবর্তন হবে, নতুন মুখ আসবে, নতুন প্রজন্ম দায়িত্ব নেবে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু পরিবর্তনের নামে ত্যাগী কর্মীদের ছুড়ে ফেলা হলে সংগঠনের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ একজন কর্মী শুধু একটি মিছিলের লোকসংখ্যা নন, তিনি একটি রাজনৈতিক আদর্শের বাহক, সংগঠনের সঙ্গে মানুষের সংযোগের মাধ্যম এবং দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার ধারক।
এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব অনেক বেশি। দলীয় পদ ও দায়িত্ব বণ্টনে স্বজনপ্রীতি, অর্থনৈতিক প্রভাব কিংবা ব্যক্তিগত আনুগত্যের পরিবর্তে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, সততা ও ত্যাগকে মূল্যায়নের মানদণ্ড করা জরুরি। নেতৃত্বে থাকলে কর্মীদের মতামত শোনার পরিবেশ তৈরি করতে হয়। তাঁদের রাজনৈতিক নিরাপত্তা, সম্মান ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।
রাজনীতি যদি মানুষের কল্যাণ, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং জনস্বার্থ প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হয়ে থাকে, তাহলে সেই রাজনীতির ভেতরে কর্মীদের মর্যাদা ও অধিকার উপেক্ষিত থাকার সুযোগ নেই। একজন কর্মীকে শুধু প্রয়োজনের সময় স্মরণ করা এবং প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে ভুলে যাওয়া রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য দীর্ঘমেয়াদে আত্মঘাতী হতে পারে।
মনে রাখতে হবে, ক্ষমতার পালাবদল হয়, নেতৃত্বের আসন পরিবর্তিত হয়, রাজনৈতিক পরিস্থিতিও বদলে যায়। কিন্তু একটি দলের দুঃসময়ের ইতিহাসে যাঁরা নিজেদের শ্রম, সময় ও ত্যাগ দিয়ে সংগঠনকে বাঁচিয়ে রাখেন, তাঁদের অবদান কখনো মুছে ফেলা যায় না।
তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে, রাজনীতির সুসময়ে যদি তৃণমূল কর্মীদের মূল্যায়ন না হয়, তাহলে দুঃসময়ে তাঁদের কাছে আবার কি কিছু প্রত্যাশা করা যায়? যে কর্মীদের ঘাম ও শ্রমে রাজনৈতিক সংগঠনের ভিত্তি তৈরি হয়, তাঁদের প্রাপ্য সম্মান ও অধিকার নিশ্চিত করা কি নেতৃত্বের নৈতিক দায়িত্ব ছিল না? রাজনীতির ভবিষ্যৎ সুস্থ ও শক্তিশালী করতে হলে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই হবে।