সাংবাদিকদের জন্য নির্ধারিত আসন। সামনে পরিচয় জানানোর জন্য সাংবাদিক লেখা স্টিকারও লাগানো। অথচ সেই আসনে বসা ব্যক্তিদের পেশাগত পরিচয় নিয়ে স্থানীয় সাংবাদিকদের মাঝে তৈরি হয়েছে প্রশ্ন। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, অনুষ্ঠানে স্থানীয়ভাবে কর্মরত পরিচিত সাংবাদিকদের অনেকেই আমন্ত্রণ পাননি। অথচ তাঁদের জন্যই ছিল না আসনের অভাব। বিষয়টি শুধু দুঃখজনক নয়, স্থানীয় সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা ও অংশগ্রহণের প্রশ্নেও উদ্বেগজনক।
নরসিংদীর বেলাব উপজেলায় অসচ্ছল, দুস্থ ও কর্মজীবী নারীদের মধ্যে সেলাই মেশিন, ঢেউটিন ও মানবিক সহায়তা বিতরণ অনুষ্ঠানে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একটি জাতীয় দিবস এবং সরকারের উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে বেলাব প্রেসক্লাবের কোনো সাংবাদিককে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। স্থানীয়ভাবে কর্মরত পরিচিত সাংবাদিকদের অনেকেই ছিলেন আমন্ত্রণের বাইরে। অথচ অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের জন্য আলাদা আসন রাখা হয়েছিল। ফলে পুরো আয়োজনের সাংবাদিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে।
সাংবাদিকতা কোনো ব্যক্তিগত পরিচয় কিংবা আয়োজকদের পছন্দ-অপছন্দের বিষয় নয়। গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা রাষ্ট্র, সরকার ও জনগণের মধ্যে তথ্যের সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করেন। সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড, জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ এবং সাধারণ মানুষের প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা লিখনীর মাধ্যমে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন। সেই বিবেচনায় স্থানীয় সাংবাদিকদের এমন একটি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো কেবল সৌজন্য নয়, বরং গণমাধ্যমের প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক সম্মান প্রদর্শনেরও অংশ।
আমি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলতে চাই না, কাউকে হেয় করাও আমার এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। তবে সাংবাদিকদের জন্য নির্ধারিত আসনে সাংবাদিক পরিচয়ের স্টিকার লাগিয়ে যাঁদের বসানো হয়েছে, তাঁদের পেশাগত পরিচয় জানার দরকার সবার। তাঁরা কোন পত্রিকা, টেলিভিশন, অনলাইন সংবাদমাধ্যম কিংবা সংবাদ সংস্থার প্রতিনিধি, তাও জানার অধিকার স্থানীয় সাংবাদিকদের রয়েছে। প্রকৃত গণমাধ্যমকর্মী হলে তাঁদের পরিচয় প্রকাশে আপত্তির কোনো কারণ থাকার কথা নয়।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। কোনো অনুষ্ঠানে আয়োজকদের পছন্দের ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানানো তাঁদের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হতে পারে। কিন্তু সাংবাদিকদের জন্য নির্ধারিত আসন ব্যবহার করে প্রকৃত সাংবাদিকদের উপেক্ষা করা হলে সেটি আর সাধারণ আমন্ত্রণের বিষয় থাকে না, বরং পেশাগত মর্যাদার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। সাংবাদিকদের উপস্থিতি শুধু আসন পূরণের বিষয় নয়, তাঁদের কাজের স্বাধীনতা, তথ্য সংগ্রহের সুযোগ এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিত্বের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড জনগণের সামনে তুলে ধরতে গণমাধ্যমের সহযোগিতা প্রয়োজন। অথচ সেই কাজের অন্যতম অংশীদার স্থানীয় সাংবাদিকদেরই যদি দূরে রাখা হয়, তাহলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রচার ও জনসম্পৃক্ততার উদ্দেশ্য কতটা সফল হবে? স্থানীয় সাংবাদিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করে আয়োজকেরা যে প্রক্রিয়ায় গণমাধ্যমের প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণ করেছেন, তার স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন।
স্থানীয় সাংবাদিকরা আয়োজক কর্তৃপক্ষের কাছে স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রত্যাশা- সাংবাদিকদের জন্য নির্ধারিত আসনে বসা ব্যক্তিদের পেশাগত পরিচয় এবং বেলাব প্রেসক্লাবসহ স্থানীয়ভাবে কর্মরত সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ না জানানোর কারণ জনসমক্ষে তুলে ধরা। এতে ভুল বোঝাবুঝির অবসান হবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হবে।
সাংবাদিকতা কারও ব্যক্তিগত অনুগ্রহের বিষয় নয়, আবার সাংবাদিকদের সম্মানও কারও দয়া বা করুণার ওপর নির্ভরশীল হতে পারে না। স্থানীয় সাংবাদিকদের উপেক্ষা করে সাংবাদিকদের জন্য নির্ধারিত আসনে অন্যদের বসানো হলে তার ব্যাখ্যা আয়োজকদেরই দেওয়া উচিত।
সাংবাদিকরা বিরোধ চাই না, চাই স্বচ্ছতা। ব্যক্তিগত বিরোধ নয়, চাই পেশাগত মর্যাদার স্বীকৃতি। কারণ সাংবাদিকদের জন্য নির্ধারিত আসনে কারা বসেছিলেন, সেটি শুধু কয়েকজন সাংবাদিকের কৌতূহলের বিষয় নয়, এটি গণমাধ্যমের পরিচয়, সম্মান ও দায়িত্বশীলতার প্রশ্ন।