শিক্ষা হলো এমন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে মানুষ জ্ঞান, দক্ষতা, যোগ্যতা, নৈতিকতা ও মূল্যবোধ অর্জন করে এবং নিজের আচরণ ও চিন্তাভাবনার উন্নতি ঘটায়। বা শিক্ষা হলো জ্ঞান অর্জন করে নিজেকে একজন ভালো, দক্ষ ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার প্রক্রিয়া। আরও বলা যায়, শিক্ষা হলো নিজেকে বিকশিত করা।
মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষক নিয়োগ পদ্ধতিতে আলাদা ধরনের পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, চাকরি পাওয়ার পর নয়, বরং নিয়োগের আগেই শিক্ষকদের প্রশিক্ষণন নিতে হবে। তবে নিয়োগের আগে কি ভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে তা উল্লেখ করা হয়নি।
শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) 'প্রফেশনালাইজেশন ফর এনহ্যান্সড লার্নিং প্রজেক্ট' নামের একটি প্রকল্পের প্রাথমিক খসড়া তৈরি করেছে। আনুমানিক ২৪৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পটির পুরোটাই বৈদেশিক অনুদান হিসেবে পাওয়ার কথা রয়েছে। চলতি বছরের নভেম্বর থেকে ২০৩০ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর পর্যন্ত সম্ভাব্য বাস্তবায়নকালের এই বাজেটের বড় অংশ খরচ হবে এ প্রশিক্ষণ, কর্মশালা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও মেরামত এবং পেশাগত সেবা খাতে।
প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, শিক্ষকতা পেশায় ঢোকার আগে প্রয়োজনীয় জ্ঞান, দক্ষতা ও মানসিক প্রস্তুতি দরকার হলেও দেশে বর্তমানে এ ধরনের প্রাক-চাকরিকালীন প্রশিক্ষণের সুযোগ নেই। তাই নতুন মডেলে প্রাথমিক পর্যায়ে পাইলট কার্যক্রম হিসেবে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানে এই প্রশিক্ষণ চালু করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি ‘শিক্ষক পেশাগতীকরণ নির্দেশিকা’ ও ‘শিক্ষক পেশাগত উন্নয়ন কাঠামো’ প্রণয়নসহ বিদ্যমান ১০টি প্রশিক্ষণ কোর্স হালনাগাদ করা এবং নতুন আরও ১০টি কোর্স চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে নিয়োগের ক্ষেত্রে এই প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক হবে নাকি অগ্রাধিকার পাবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
এছাড়া প্রকল্পটির আওতায় ২০ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষা প্রশাসক এবং দেড় হাজার প্রধান শিক্ষককে চাকরিকালীন প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
শিক্ষাবিদেরা এই উদ্যোগকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো উন্নত দেশগুলোতেও শিক্ষকতায় প্রবেশের আগে এ ধরনের বিশেষ পড়ালেখা বা লাইসেন্স নেওয়ার নিয়ম রয়েছে। তবে দেশে এই ব্যবস্থা সফল করতে একটি সুস্পষ্ট ও সমন্বিত শিক্ষানীতির অধীনে কার্যক্রম পরিচালনার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
উল্লেখ্য, দেশে বর্তমানে মোট ২ লাখ ৪৬ হাজার ৭৮৪ জন মাধ্যমিক শিক্ষক রয়েছেন, যার মধ্যে নারী ৭৩ হাজার ৪৯ জন। সরকারি স্কুলে পিএসসি এবং বেসরকারি স্কুলে এনটিআরসিএ-র মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। বর্তমানে অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে
নতুন শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ নয়, কর্মরত শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বাড়ানোর বিষয়টিও প্রকল্পে গুরুত্ব পেয়েছে। এ জন্য ‘শিক্ষক পেশাগতীকরণ নির্দেশিকা (টিপিজি)’ এবং ‘শিক্ষক পেশাগত উন্নয়ন কাঠামো (টিপিডিএফ)’ প্রণয়নের প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে চাকরিরত শিক্ষকদের ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়ন কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।
মাউশির পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন উইং) অধ্যাপক ড. মীর জাহীদা নাজনীন বলেন, শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে বর্তমান সরকার বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। এসব উদ্যোগের অংশ হিসেবে শিক্ষক নিয়োগের আগেই প্রার্থীদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
প্রকল্পটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা) ড. সরদার মো. কেরামত আলী বলেন, প্রস্তাবটি এখন অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। ফলে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
সরকারও এ খাতের সংস্কারে আন্তরিক। সম্প্রতি বিশ্ব শিক্ষক দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উল্লেখ করেছেন যে, শিক্ষকতাকে আর ১০টি সাধারণ চাকরির মতো উপায়হীন বিকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে যেন সেরা প্রার্থীরা শিক্ষকতাকে প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নিতে পারেন, সরকার সেভাবেই পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে সাজাচ্ছে।
একরামুল ইসলাম তুষার, সহকারী অধ্যাপক, আবুবকর বিশ্বাস মকছেদ আলী কলেজ, কালীগঞ্জ ঝিনাইদহ।