বরিশাল বিভাগের সরকারি বিভিন্ন ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা করা হলেও অতিরিক্ত বিদ্যুতের বিপরীতে বিল সমন্বয়ের সুবিধা এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি। নেট মিটারিং কার্যকর না হওয়ায় উৎপাদিত বিদ্যুতের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয়ের সম্ভাবনাও পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগের বরগুনা, পিরোজপুর, পটুয়াখালী ও ঝালকাঠি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে মোট ২১০ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এসব ব্যবস্থা স্থাপনে ব্যয় হয়েছে ৪১ লাখ ২১ হাজার টাকা। এ ছাড়া বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ২০ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে খরচ হয়েছে ৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা।
তবে বরিশাল ও ভোলা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সক্ষমতার তথ্য পাওয়া যায়নি। ঝালকাঠিতে বরাদ্দ থাকলেও সংশ্লিষ্ট অর্থ ব্যয় করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে বরিশাল বিভাগের সরকারি কার্যালয়গুলোতে সৌরবিদ্যুৎ কার্যক্রমের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না।
শুধু বরিশাল বিভাগেই নয়, দেশের বিভিন্ন জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত জুন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়গুলোতে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার মোট সক্ষমতা ৪ হাজার ৬৬৩ কিলোওয়াট। অন্যদিকে, পাঁচটি বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে এ সক্ষমতা ৪০৫ দশমিক ৫ কিলোওয়াট। সব মিলিয়ে উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৬৮ দশমিক ৫ কিলোওয়াট, যা প্রায় ৫ দশমিক ০৭ মেগাওয়াট।
সরকারি ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৫ কোটি ১৪ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। সরকার নিজস্ব অর্থায়নে ক্যাপেক্স মডেলে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে।
বিভাগভিত্তিক ব্যয়ের হিসাবে ঢাকা বিভাগের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়গুলোতে খরচ হয়েছে ২ কোটি ৮৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা। খুলনায় ২ কোটি ৭৪ লাখ ৬৩ হাজার, রাজশাহীতে ২ কোটি ৪৮ লাখ ৯৯ হাজার, রংপুরে ২ কোটি ৮ লাখ ৫২ হাজার, সিলেটে ১ কোটি ৫৪ লাখ ৮ হাজার এবং চট্টগ্রামে ১ কোটি ২৮ লাখ ৯৪ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে।
এ ছাড়া খুলনা, রংপুর, রাজশাহী, সিলেট ও বরিশাল বিভাগের কমিশনারের কার্যালয়েও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। তবে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের সক্ষমতা ও ব্যয়ের তথ্য পাওয়া যায়নি। ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় ভাড়া ভবনে পরিচালিত হওয়ায় সেখানে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
নেট মিটারিংয়ে বিল সমন্বয়ের অপেক্ষা
ছাদে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে দিনের বেলায় সরকারি কার্যালয়গুলোর বিদ্যুতের চাহিদার একটি অংশ পূরণ করা যাচ্ছে। তবে উৎপাদিত বিদ্যুতের অতিরিক্ত অংশ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে তার বিপরীতে বিল সমন্বয়ের সুবিধা এখনো সব ক্ষেত্রে চালু হয়নি। নেট মিটারিংয়ের অনুমোদন ও সংযোগসংক্রান্ত প্রক্রিয়া চলমান থাকায় এ ক্ষেত্রে বিলম্ব হচ্ছে।
নেট মিটারিং কার্যকর হলে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যাবে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, এর বিপরীতে বিদ্যুৎ বিল সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হবে। এতে সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ ব্যয় কমানোর পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডের ওপর নির্ভরশীলতাও হ্রাস পেতে পারে।
এর একটি উদাহরণ শরীয়তপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়। ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) শরীয়তপুর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সেখানে ২৪ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। তবে নেট মিটারিংয়ের আবেদন প্রক্রিয়াধীন থাকায় অতিরিক্ত বিদ্যুতের বিপরীতে বিল সমন্বয় এখনো শুরু হয়নি।
ওজোপাডিকোর তথ্য অনুযায়ী, শরীয়তপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রতি মাসে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৫ হাজার ইউনিট। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালুর পর প্রতি মাসে প্রায় ৮০০ ইউনিট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ নেওয়ার পরিমাণ কমছে এবং বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয় হচ্ছে।
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের তাগিদ
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) লিড অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম মনে করেন, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়গুলোতে স্থাপিত ৫ মেগাওয়াটের বেশি সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা জাতীয় পর্যায়ে বড় অবদান না রাখলেও এর কার্যকর ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, এসব সরকারি ভবনে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সফল ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে সরকারি ও বেসরকারি অন্যান্য ভবনেও ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে উৎসাহ তৈরি হবে। এ খাতের প্রসারে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও গ্রামীণ পর্যায়েও গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি নেট মিটারিং সংযোগের দীর্ঘসূত্রতা কমাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন এবং নেট মিটারিং সংযোগের কার্যক্রম সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক শিল্পী রানী রায় জানান, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের উদ্যোগের আওতায় মেহেরপুরে ইতোমধ্যে ৮০ কিলোওয়াট সক্ষমতার ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো গেলে জাতীয় গ্রিডের ওপর বিদ্যুতের চাহিদাজনিত চাপ কমাতে সহায়তা করবে। বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মোকাবিলা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর বিকল্প নেই।
সরকারের ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র ২০২৬-২০৩০’-এ ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট আসার কথা ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে।
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট সক্ষমতা ১ হাজার ৯৩৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা ১ হাজার ৬৪২ মেগাওয়াট।
এ অবস্থায় সরকারি ভবনের ছাদে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা, দ্রুত নেট মিটারিং চালু করা এবং যেসব সরকারি কার্যালয়ে এখনো সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়নি, সেখানে কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা জরুরি। এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বিদ্যুৎ ব্যয় কমানোর পাশাপাশি দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও অগ্রগতি সম্ভব হবে।