ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ত্রিপক্ষীয় শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু করতে সম্মত হয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। আগামী মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে এ আলোচনা শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছে ক্রেমলিন।
বুধবার রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে প্রায় তিন ঘণ্টার বৈঠক করেন পুতিন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের অন্যতম রক্তক্ষয়ী সংঘাত বন্ধে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
ক্রেমলিনের তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ত্রিপক্ষীয় আলোচনা কারিগরি পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হবে। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ইউক্রেন ও রাশিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উপায় নিয়ে এতে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। আগামী ১০ নভেম্বর অথবা এর পরবর্তী সময়ে আলোচনা শুরু হতে পারে। এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সর্বশেষ শান্তি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
তবে শান্তিচুক্তির শর্ত নিয়ে মস্কো ও কিয়েভের মধ্যে এখনো বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে। পুতিনের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে পূর্ব ইউক্রেনের দোনেৎস্ক অঞ্চলের ওপর রাশিয়ার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, ইউক্রেনের ন্যাটোতে যোগদানের সম্ভাবনা বাতিল এবং সাময়িক যুদ্ধবিরতির পরিবর্তে পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি সম্পাদন।
পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের আগে নরওয়ের রাজধানী ওসলোর বৈঠকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি, ফিনল্যান্ড ও নরওয়ের নেতাদের পাশাপাশি ইউরোপীয় ও ন্যাটোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেন উইটকফ। ওই আলোচনায় ইউক্রেন নতুন কিছু প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানিয়েছেন এক মার্কিন কর্মকর্তা। তবে ক্রেমলিনের সহযোগী ইউরি উশাকভ জানান, এসব প্রস্তাবে রাশিয়া পুরোপুরি সন্তুষ্ট নয়।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনের ওপর দ্রুত শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর চাপ বাড়িয়েছেন। মঙ্গলবার তিনি বলেন, যুদ্ধ শেষ করার সময় এসেছে, অন্যথায় ইউক্রেনকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। জেলেনস্কিও পুতিন ও ট্রাম্পের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে যুদ্ধ অবসানের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার আশা প্রকাশ করেছেন। তবে ক্রেমলিনের মতে, দুই নেতার সম্ভাব্য বৈঠকের আগে উভয় পক্ষের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে।
বুধবারের বৈঠকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ নিরসনে সহযোগিতার প্রস্তাবও দেন পুতিন। তেহরানের সঙ্গে মস্কোর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব বলে তিনি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকদের সহায়তায় রাশিয়া বিপুল পরিমাণ সার সরবরাহ করতে পারে বলেও জানান তিনি।
এ ছাড়া আগামী মাসে চীনে ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য বৈঠক নিয়েও আলোচনা হয়। ক্রেমলিন জানিয়েছে, এ বৈঠকের প্রস্তুতি শুরু করেছে বেইজিং। পুতিনের বিশেষ বিনিয়োগ দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের যৌথ অর্থনৈতিক প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানানো হয়।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে সম্পর্কের টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি-সংক্রান্ত চুক্তির ঘোষণা এবং ইউক্রেনের গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও সামরিক স্যাটেলাইট ব্যবস্থার ব্যবহার নিয়ে বিভিন্ন জটিলতার খবর সামনে এসেছে। তবে জেলেনস্কি জানিয়েছেন, ওসলোর বৈঠকে এসব সমস্যা সমাধানে একটি সমঝোতা হয়েছে।
এদিকে, মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গত সপ্তাহে ইলন মাস্ক ইউক্রেনের সামরিক কাজে ব্যবহৃত স্টারলিংক স্যাটেলাইট পরিষেবার গতি কমানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে এ প্রতিবেদনের সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স। মাস্ক বলেছেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত মার্কিন সামরিক বাহিনী অথবা প্রেসিডেন্ট নিয়ে থাকেন। ট্রাম্পও এ ঘটনায় নিজের দায় অস্বীকার করেছেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, ইউক্রেনের স্টারলিংক ব্যবহারের সুযোগ সীমিত করতে ওয়াশিংটন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
শান্তি আলোচনা শুরুর বিষয়ে সম্মতি এলেও ভূখণ্ড, নিরাপত্তা এবং সামরিক জোটে ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ অবস্থান নিয়ে মতপার্থক্য দূর করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। ফলে প্রস্তাবিত ত্রিপক্ষীয় আলোচনা যুদ্ধ অবসানের পথে কতটা অগ্রগতি আনতে পারে, তা নির্ভর করছে দুই পক্ষের সমঝোতার ওপর।