আজাদ সিনেমা হলের মালিকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানীর অভিযোগ

Date: 2024-11-25
news-banner

 

বিশেষ প্রতিনিধি:

 

আজাদ সিনেমা হলের মালিক ইমরান, ইকবাল ও এরশাদ এবং ম্যানেজার আলাউদ্দিন মাল সোহেল এর বিরুদ্ধে যৌন হয়রানী ও মারধরের অভিযোগ এনেছেন শিউলী আক্তার (২৫) নামের এক নারী। অভিযোগের ভিত্তিতে ভিকটিম শিউল আক্তার তাদের বিরুদ্ধে বুধবার (১৯ নভেম্বর) আদালতে একটি মামলাও দায়ের করেছেন। দন্ডবিধির ১৪৩/৩২৬/৩২৩/৩০৭/৪৪৭/৫০৬/৩৪ ধারায় যার সি.আর মামলা নং- ২৫৬/২০২৪।

 

মামলা সূত্রে জানা যায়, ভিকটিম শিউলী আক্তারের স্বামী টিটু চন্দ্র দে এর আজাদ সিনেমা হল সংলগ্ন মাসিক ভাড়ায় চালিত একটি পার্কিং গ্যারেজ ও ছোট্ট একটি ফাস্টফুডের দোকান রয়েছে। স্বামীর এই ব্যবসায় সহযোগীতা করবার জন্য শিউলী আক্তার প্রায়ই সেখানে গিয়ে সময় দিয়। দীর্ঘদিন সেখানে আসা-যাওয়ার কারণে অভিযুক্তদের সাথে শিউলী আক্তারের পরিচয় ঘটে। এই পরিচয়ের সূত্র ধরে ১ নং বিবাদী ইমরান তাকে নানাভাবে উত্যক্ত এবং একাধিক সময় নানাভাবে কু প্রস্তাব দেয়।

 

জানা যায়, আজাদ সিনেমা হলটি নারী ও মাদক ব্যবসার অভয়ারণ্য হয়ে ওঠায় এখানে প্রতিনিয়ত মাদক ব্যবসায়ী ও মাদক সেবনকারীদের আসা-যাওয়া চলতে থাকে। ঘটনার দিন ৯ নভেম্বর (শনিবার) সকালে সিনেমা হলের সামনে ভিকটিম শিউলীর সাথে ১ নং বিবাদী ইমরানের দেখা হলে সে হলকে কেন্দ্র করে নারী ও মাদক ব্যবসার বিষয়টি তাকে জানায়। এসময় ইমরান কোনো কিছু না বলে চলে যায়। পরে বিকাল ৪ টার দিকে ২ নং বিবাদী আলাউদ্দিন মাল সোহেল শিউলীর কাছে এসে জানায় যে, ‘সে যেন তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আর না আসে’ এবং এটি ৩ নং বিবাদী ইকবালের নির্দেশ বলেও জানায় সে। তখন ভিকটিমের সাথে কথা কাটা-কাটির এক পর্যায়ে ২ নং বিবাদী আলাউদ্দিন মাল সোহেল ও ৪ নং বিবাদী এরশাদসহ তাদের গুন্ডাবাহিনী ডেকে ভিকটিমকে মারধর ও শারীরিক নির্যাতন করে। ভিকটিম প্রেশারের রোগী হওয়ায় তাৎক্ষনিক অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রাথমিক চিকিৎসা করিয়ে বাসায় চলে যায়। পরবর্তীতে অসুস্থতা অনুভব করলে বাধ্য হয়ে ঢাকা মেডিকেলে গিয়ে চিকিৎসা গ্রহন করে।

 

মামলার বিবরণে আরও জানা যায় যে, ভিকটিম শিউলী আক্তারকে ১ নং বিবাদী ইমরান বেশ আগে থেকেই কু-প্রস্তাব দিয়ে আসছিল। বিষয়টি তার স্বামী টিটুকে জানালে টিটু একাধিকবার ইমরানকে সতর্ক করলেও কোনো কাজ হয়নি। এক পর্যায়ে গত ৫ মে-২০২৩ খ্রি. তারিখ, সন্ধ্যা আনুমানিক ৬ টার দিকে ১ নং বিবাদী ইমরান ভিকটিম শিউলীকে আজাদ সিনেমা হলের ভিতরে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ চেষ্টা চালায়। এসময় ভিকটিমের চিৎকারে আশে পাশের লোকজন জড়ো হয়ে গেলে সে যাত্রায় ভিকটিম রক্ষা পায়। এ ঘটনায় উল্টো ভিকটিম ইমরানের সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে, এমন অভিযোগ এনে ইমরানের নেতৃত্বে ২ নং বিবাদী আলাউদ্দিন মাল সোহেল একটি গুন্ডা গ্রুপ ভাড়া করে পরদিন ৬ মে-২০২৩ খ্রি. তারিখ বিকাল ৫ টার দিকে ৩ নং বিবাদীর উপস্থিতিতে ভিকটিমকে ২ ও ৪ নং বিবাদী মারধর করে মাথা ফাটিয়ে দেয়। এসময় ভিকটিমের শরীরে থাকা জামা-কাপড় টেনে ছিড়ে ফেলে তারা। ভিকটিমের ছোট বোন ঘটনাস্থলে এসে রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করতে গেলে তাকেও মারধর করা হয়। পরে ভিকটিম তার স্বামী ও বোনের সাহায্যে উদ্ধার হয়ে স্যার সলিমুল্লাহ হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়। সেখানে তার মাথায় জখমের কারণে ৬/৭ টি সেলাই করা হয়।

 

এ ঘটনার পর শিউলী আক্তারকে মারধরকারীরা তার পরিবারের কাছে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে বিষয়টি সমাধানের আবেদন জানায়। সেখানে তৃতীয় একটি পক্ষ শিউলী আক্তারকে আর কখনো বিরক্ত ও উত্যক্ত করা হবে না মর্মে ২ পক্ষকে আপোষ করে দেয়। যার কারণে শিউলী আক্তার ঐ সময় তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করেননি।

 

এ বিষয়ে আজাদ হল ম্যানেজার আলাউদ্দিন মাল সোহেলের সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি বলেন, তাদের দ্বারা শিউলীকে মারধরের কোনো ঘটনা ঘটেনি। বরং শিউলী, শিউলীর স্বামী টিটু ও ভাগিনা নিজেরাই নিজেদের মধ্যে মারামারি করে শিউলীর মাথা ফাটিয়েছিল। তিনি অভিযোগ করে বলেন, তারা ক্যান্টিনের (ফাস্টফুডের দোকান) ভাড়াও ঠিকমত পরিশোধ করে না। অন্যদিকে মামলার সাক্ষীদের মধ্য হতে একাধিক জনের সাথে কথা বলে মামলার বিরণের সাথে মিল পাওয়া যায়।

 

রাজধানী ঢাকার প্রথম দিককার সিনেমা হলগুলোর মধ্যে অন্যতম আজাদ সিনেমা হলটি কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে পুরান ঢাকার জনসন রোডে। আজাদ সিনেমা হল ঐতিহ্যের কঙ্কাল হয়ে এখনো সচল রয়েছে, তবে জীবনপ্রদীপ যেন নিবুনিবু। এই হলটিই একসময় ঢাকার অভিজাত পরিবারের সদস্যদের বিনোদনের মূল কেন্দ্র ছিল। লেখক, চিত্রশিল্পী, চলচ্চিত্রের শিল্পী-কলাকুশলীদের পদভারে মুখরিত থাকত আজাদ সিনেমা হল। ঘোড়ার গাড়ি ও রিকশায় চড়ে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষজন আসতেন সিনেমা দেখতে। ইংলিশ, উর্দু, হিন্দি ও বাংলা ছবিতে বিশ্বকে দেখতেন তাঁরা। প্রয়াত কবি শামসুর রাহমান, চিত্রশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, লেখক সরদার ফজলুল করিম ও সৈয়দ শামসুল হকের মত বিখ্যাত ব্যক্তিরাও এই সিনেমা হলে নিয়মিত ছবি দেখার জন্য আসতেন।

 

কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে প্রায় ৯০ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই সিনেমা হলটি। ‘বি গ্রেড’ সিনেমা প্রদর্শন এবং রুচিহীন কর্মকাণ্ডে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে দর্শক। বর্তমানে সেখানে দর্শকের বদলে জায়গা করে নিয়েছে মাদকসেবী আর অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িতরা। প্রশাসনের নাকের ডগায় এসব কর্মকাণ্ড চললেও নেওয়া হয় না কার্যকর কোনো ব্যবস্থা।

 

১৯৬৪ সালে বোম্বের শের আলী রামজি এ হলটি মুকুল বাবুর কাছ থেকে কিনে নেন। তিনি নতুন নাম দেন আজাদ সিনেমা। ভবনটির নাম আজাদ ম্যানশন। ১৯৭৪ সালে ঢাকার এক চলচ্চিত্রপ্রেমী এ ইউ এম খলিলুর রহমান আজাদ সিনেমা হল কিনে নেন শের আলী রামজির কাছ থেকে। খলিলুর রহমানের মৃত্যুর পর এখন তাঁর চার ছেলে এই হলের মালিক বলে জানা যায়। 

Leave Your Comments